সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালকসহ আটক ২

নিউজ ডেস্ক : রাজধানীর গ্রিন রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আফিয়া আক্তার চৈতির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করেছেন ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. আমজাদ আলী। ওই ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালকসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ জানান, ওই ঘটনায় বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বাদী হয়ে এক পরিচালক ও আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছেন। আমরা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সহকারী কমিশনার (এসি, ধানমণ্ডি জোন) আব্দুল্লাহেল কাফী জানান, ঘটনাস্থল থেকে এক পরিচালক ও এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় পরিচালক ও আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ধানমণ্ডি থানায় করা মামলা হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা করছেন। এদিকে ভুল চিকিৎসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার তারা কাজ শুরু করবেন।
আফিয়া জাহান চৈতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। চৈতির চাচাতো ভাই মো. আসাদুজ্জামান জানান, বুধবার জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় আফিয়া। তখন তার লিউকোমিয়া (রক্ত বা অস্থিমজ্জার ক্যান্সার) হয়েছে বলে জানায় ডাক্তাররা। সেই অনুযায়ী তাকে চিকিৎসাও দেয়। মধ্যরাতে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে আইসিইউতে নেয়া হয়। তাকে কেমোথেরাপি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার বিকেলে তার মৃত্যু হয়েছে। পরে হাসপাতাল থেকে জানানো হয় যে, তার ডেঙ্গু হয়েছে।
তিনি আরো জানান, বুধবার আফিয়ার রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে রক্তে ডেঙ্গুর উপস্থিতি ছিল না। ওই দিনই অন্য এক রিপোর্টে ‘অ্যাকিউট মায়োব্লাস্টিক লিউকোমিয়া’ বা ব্লাড ক্যান্সারের কথা উল্লেখ ছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরেই চৈতি মারা গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিকেলে জানায়। মৃত্যুর সংবাদ জানাজানি হলে তার সহপাঠীরা হাসপাতালে এসে ভাঙচুর করে ও অভিযুক্ত চিকিৎসককে থানায় নিয়ে যায়। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে।
চৈতির গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে তাকে দাফন করা হবে বলেও জানান আসাদুজ্জামান। আফিয়া আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন সরকারী আবাসিক এলাকায় মেস বাসায় থাকতেন। সম্প্রতি সুফিয়া কামাল হলে সিট পেয়েছেন। গতকাল তার হলের ফি সংক্রান্ত টাকা জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই তার সব আশা শেষ হয়ে গেল।
তার রুমমেটরা জানান, কয়েকদিন ধরেই আফিয়া জ্বরে ভুগছিল। বুধবার রাতে জ্বর বাড়লে তাকে গ্রিনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা প্রথমে ক্যান্সার হয়েছে এবং ক্যান্সারের শেষ অবস্থায় রয়েছে বলে তাদের জানায়। সেই হিসেবে তাকে ক্যান্সারের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু সকালে অবস্থা আরো বেগতিক হলে তাকে কেবিন থেকে আইসিইউতে পাঠানো হয়। তখন চিকিৎসকরা জানায় যে- তার ক্যান্সার হয়নি, ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। এ সময় রক্ত লাগবে বলে সহপাঠীদের জানানো হয়। পরে আফিয়ার কয়েকজন সহপাঠী রক্ত দেওয়ার জন্য হাসপাতালে আসেন। কিন্তু তাদের মধ্যে দুয়েকজনের কাছ থেকে রক্ত নেওয়া হলেও বাকীদের রক্ত পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করেও তা আর নেওয়া হয়নি।
চিকিৎসকরা প্রথমে ক্যান্সার ও পরে ডেঙ্গু জ্বরের ওষুধ প্রয়োগ করে আফিয়াকে হত্যা করেছে বলে সহপাঠী ও স্বজনরা অভিযোগ করেন এবং তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের শাস্তির দাবি করেন।
ভুল চিকিৎসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করেছেন সেন্ট্রাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট অধ্যাপক শেখ এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, রোগী ভর্তির সময় তার রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট ছিল মাত্র ১৬ হাজার। এ অবস্থায় কোনও রোগীকে ওয়ার্ডে রাখাটাই ছিল গাফিলতি।
হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন মতিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনার তদন্তে শুক্রবার তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ আলী জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে আফিয়ার মৃত্যু হয়েছে। অবহেলার দায়ে এক পরিচালক ও বিভিন্ন সময়ে ওই ছাত্রীকে চিকিৎসা দেওয়া আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। রাত ৮টার দিকে একটি গাড়িতে করে ওই ছাত্রীর লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।

Comments

comments

LEAVE A REPLY