রাজীব নূর ও আবদুর রহমান, উখিয়া থেকে: মোহাম্মদ হাশিম বাড়ি ছেড়ে আসার সময় কিছুই সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেননি। এনেছেন শুধু সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি দুটি। অনেক কষ্ট করে কিনেছিলেন বৈদ্যুতিক এই সরঞ্জামগুলো। কারণ তার স্ত্রীর প্রচন্ড মাথাব্যথার অসুখ আছে এবং তিনি গরম একেবারে সহ্য করতে পারেন না। সেই সোলারেই এখন কুতুপালং এ-ওয়ান নিউ ব্লকে হাশিমের ঘরে বাতি জ্বলছে, পাখা ঘুরছে। মংডু থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রোহিঙ্গা গ্রাম ভুগিরচরে কোনোদিন বিদ্যুৎ আসবে এবং সেই বিদ্যুতে চালানো পাখা গরম সহ্য করতে না পারা হাশিমের স্ত্রীর কষ্ট দূর করবে- এমনটা তিনি ভাবতেও পারেননি। ভাবতে না পারার একটা কারণ জানা গেল চীনের বার্তা সংস্থা সিনহুয়া প্রচারিত এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে, রাখাইনে যে ৩০ লাখ মানুষের বসতি, তারা সারাবছরে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পায়, যা মিয়ানমারে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ১.৮ ভাগ।

গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বশেষ ৯ অক্টোবর পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের বিভিন্ন পথ ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, তাদের সঙ্গে আনা সবচেয়ে দামি বস্তুটি হচ্ছে, এসব সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি। কয়েক দিন থেমে থাকার পর ৯ অক্টোবর আবারও রোহিঙ্গার ঢল নেমেছিল উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে। ওই দিন আলাপ হলো বুচিডংয়ের থাইম্যাখালি গ্রামের আহমদুল্লাহর সঙ্গে। তিনি চিন্তাও করতে পারেননি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের  শিবিরগুলো বিদ্যুতায়নে দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা শুনে বিস্ট্মিত মিয়ানমারের অন্ধকার রাজ্য রাখাইনের বাসিন্দারা।
সর্বক্ষেত্রেই রাখাইন, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের অঞ্চল রাখাইনের মংডু, বুচিডং (বুথেডং) ও রাশিদং (রাথেডং) অনেক পিছিয়ে রয়েছে। খোদ মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সম্পূূর্ণ রাখাইন রাজ্যের হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা মিয়ানমারের রাজধানীতে অবস্থিত ইয়াঙ্গুন সাধারণ হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার সমান। রাখাইন রাজ্যে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। ২০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি সাধারণ হাসপাতাল আছে, যেখানে কিছু বিশেষায়িত সেবা পাওয়া যায়। এ ছাড়া আরও ১৬টি হাসপাতালে আছে ৫৫৩ শয্যা। হেলথ ক্লিনিক ২৪টি, যেখানে ৩৮৪ জন রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৫১৫, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৩৭টি এবং মাত্র ৬৯টি উচ্চ বিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ১১ হাজার ৪৫ জন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই হাজার ৯০৯ জন এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে এক হাজার ৩৩৭ জন। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়টি আছে সিত্তওয়েতে।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত দ্যা অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট রাখাইনে বর্তমান সংকট নিরসনে যে প্রস্তাবনা দিয়েছে, তার অন্যতম অংশ হচ্ছে রাখাইনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন; রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়া এবং তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ।

আরও পড়ুনঃ   দুইশ বছরের পুরোনো রোহিঙ্গা সংকট এবং একজন ‘পিতৃভক্ত’ সু চি!

রাখাইনে বর্তমানে স্বাস্থ্য ও শিরার যে সীমিত সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই রোহিঙ্গাদের জন্য নয় বলে জানালেন সদ্য বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা বৃদ্ধ সাব্বির আহমদ। তিনি জানান, রোহিঙ্গারা সর্বোচ্চ ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে। সরকারি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা পায় না বলে কবিরাজি চিকিৎসাই তাদের ভরসা। ১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণকারী সাব্বির আহমদ বাংলাটা বুঝতে পারেন, বলতে পারেন না। তবে ইংরেজিতে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ তিনি। পড়াশোনা শেষে সরকারি চাকরি করেছেন। তিনি মনে করতে পারেন ১৯৪৮ সালে বার্মার স্বাধীনতা লাভের ক্ষণটি। মনে আছে অং সান সু চির বাবা অং সান নিহত হওয়ার ঘটনা। তার মতে, অং সানের মৃত্যুই রোহিঙ্গাদের জীবনে দুর্যোগ ডেকে এনেছে। সু চি তার বাবার কুলাঙ্গার সন্তান। সু চির হাত ধরে সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হচ্ছে’ বাস্তুচ্যুত করছে রোহিঙ্গাদের। তিনি বলেন, ‘দিনে দিনে এমন অবস্থা হয়েছে, আমরা যে বলি, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে- এ তিনটি আল্লাহর হাতে; রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য এগুলোও চলে গেছে সেনাবাহিনীর হাতে। মিয়ানমারের মতো বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি পৃথিবীর আর কোথাও নেই।’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের একটি প্রতিবেদনেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পেছনে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতির কথা বলা হয়েছে। ফাঁস হয়ে যাওয়া মিয়ানমারের সরকারি কিছু দলিল অবলম্বনে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে ‘রিজিওনাল অর্ডার ১/২০০৫’ উল্লেখ করে বলা হয়, এই আদেশে রোহিঙ্গাদের দুই সন্তান নীতি প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বাস্তবায়নের একটি উপায় বাতলে দিচ্ছে ফর্টিফাই রাইটসের কাছে থাকা অন্য একটি দলিল। এ দলিলটি বলছে, সেনা কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা মায়েদের বাধ্য করবে সৈনিকদের উপস্থিতিতে বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়াতে, যাতে কোনো পরিবার অন্যের বাচ্চাকে আশ্রয় দিতে চাইলে তা ধরা পড়ে যায়। মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এই আদেশ যে রোহিঙ্গারা উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে, তা এবারও পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রায় সবারই দুইয়ের অধিক সন্তান দেখে বোঝা যাচ্ছে। তবে ফর্টিফাই রাইটসের প্রতিবেদন বলছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আদেশের পর অনেক রোহিঙ্গা নারী গর্ভপাত করাতে গিয়ে মারা গেছে। এ আদেশ মানুষের বিয়ে করা এবং পরিবার স্থাপনের যে চিরাচরিত রীতি রয়েছে, তার চরম লগ্ধঘন।

আরও পড়ুনঃ   পালাতে গেলে কুপিয়ে হত্যা ধরা পড়লে গুলি

রাখাইন রাজ্যে টাউনশিপ আছে ১৭টি। প্রশাসনিক বিন্যাসে মিয়ানমারের টাউনশিপ অনেকটা বাংলাদেশের জেলার মতো। ২০১২ সালের আগপর্যন্ত সব ক’টি টাউনশিপ মিলে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ব্যাপক বিতাড়নের শিকার না হলে এতদিনে রাখাইনে রোহিঙ্গারা ৭০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যেত। যারা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা উপেক্ষা করে রাখাইনে রয়ে গেছে, তাদের ওপরই এসব আদেশ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফর্টিফাই রাইটসের ফাঁস করা মিয়ানমারের আরেকটি সরকারি দলিল থেকে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের বিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে ১৯৯৩ সাল থেকে। সরকারের কাছ থেকে বিয়ে করার অনুমতির জন্য রোহিঙ্গাদের ১০ ধরনের শর্ত পূরণ করতে হবে বলে দলিলটি থেকে জানা যায়। শরণার্থী রোহিঙ্গাদের মধ্যে সরেজমিন অনুসন্ধানে সরকারি অনুমতি না নিয়ে মোল্লা দিয়ে বিয়ে পড়ানোর অনেক ঘটনা জানা গেছে। লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের নেতা আবদুল মতলব জানান, ধর্মীয় রীতিতে হওয়া এ ধরনের বিয়েকে মিয়ানমার সরকার বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক হিসেবে ধরে নেয়। সরকারের অনুমোদন না নিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনকারী দম্পত্তিরা যেন সন্তান নিতে না পারে, সে জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আদেশে বিয়ে-বহির্ভূতভাবে সন্তান জন্মদানেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
ফর্টিফাই রাইটসের ফাঁস করা আরও একটি দলিল বলছে, রোহিঙ্গারা তাদের টাউনশিপ থেকে অন্য কোনো টাউনশিপে যেতে চাইলে, এমনকি নিজেদের টাউনশিপের মধ্যে চলাচল করতে চাইলেও পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ দিন ধরে এই পরিস্থিতির মধ্যেও রাখাইন রাজ্যে টিকে থাকা রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি দেশ থেকে বিতাড়নের কৌশল নিয়েছে মিয়ানমার সরকার, যার পরিণতিতে ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। মাঝে কয়েক দিন রোহিঙ্গাদের আসা একটু কম ছিল। কিন্তু গত সোমবার ও গতকাল মঙ্গলবার হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আশ্রয়ের জন্য। গত দু’দিনে আসা এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, ওপারে আরও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   যদি একটি নিউক্লিয়ার বোমাও ছোড়ে উত্তর কোরিয়া, তবে চিত্রটা ঠিক কেমন হবে?

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

fifteen − 12 =