আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ- রাষ্ট্রের এই তিনটি অঙ্গের মধ্যে সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। একই সঙ্গে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যা কিছু করা সম্ভব তার সবই করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগে আইন প্রণয়ন অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেছেন  প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাস কক্ষে তাকে সংবর্ধনা ও অভিনন্দন জানান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবদিন ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ সময় আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে শুক্রবার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট।

পরে আইন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধান বিচারপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান প্রেসিডেন্ট। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর গতকালই ছিল তার প্রথম কর্মদিবস। গতকাল সকাল সাড়ে দশটার কিছু পরে প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবদিন প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য দেন।
সংবর্ধনা ও অভিনন্দনের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, এই বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করে আমি আজ ধন্য ও গর্বিত। আমার প্রতি আপনারা যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন তাতে আমি গভীরভাবে অভিভূত। প্রধান বিচারপতি বলেন- আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের এই তিন অঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কেবল একটি দেশ উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে। যেখানে এই তিন অঙ্গের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকে, সেখানে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কাজের মধ্যে যেন সমন্বয় রক্ষা করা যায়, সে জন্য আমি সব সময় চেষ্টা করবো। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট যেন সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংবিধান অনুসারে তার নিজ দায়িত্ব পালন করে সেটিও আমি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবো।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি এ কথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, দেশে দৃঢ়ভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিটি মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য যা কিছু আমার পক্ষে করা সম্ভব, তার সবটুকুই আমি করবো। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের অগ্রসরতার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, আমি তার সবকিছু করার চেষ্টা করব। বিচার বিভাগের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বিচারকদের দেশ বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, দেশে একটি ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি প্রতিষ্ঠা, মামলা অনুপাতে বিচারকসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করতে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আমার প্রাথমিক লক্ষ্য। সকল স্তরের বিচারকরা যেন তাদের এজলাস সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার  করেন, আমি সেটি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবো।
প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যেন সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংবিধান অনুসারে তার নিজ দায়িত্ব পালন করে, সেটিও আমি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবো। আমাদের এমনভাবে আদালতের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে যেন আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে  শক্তিমান-দুর্বল, ধনী-গরিব, সকলের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মে যে তারা সকলেই সমান এবং আদালতের কাছ থেকে শুধু আইন অনুযায়ী তারা  ন্যায়বিচার পাবেন। এতে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস দৃঢ়  হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৯৫ (২) (গ)  অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগের আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। বিচারকদের সবচেয়ে বড় শক্তি সততা। তার জবাবদিহির জায়গা হচ্ছে নিজের বিবেক। সংবিধান ও দেশের আইন তার একমাত্র অনুসরণীয়। আর শপথকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে কারও প্রতি অনুরাগ বা  বিরাগের বশবর্তী না হয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা হবে তার দায়িত্ব।  তিনি বলেন, বিচারক যদি শুধু তার শপথ অনুযায়ী বিচারকাজ পরিচালনা করেন, তাহলে তার জন্য আলাদা অনুসরণীয় আচরণবিধির তেমন প্রয়োজন হয় না। প্রধান বিচারপতি আশা প্রকাশ করে বলেন, আমার সহকর্মী সকল বিজ্ঞ বিচারক সবসময় তাদের শপথের মূল বাণী হৃদয়ে প্রোথিত করে জনগণ ও মানবতার কল্যাণে সংবিধানকে সামনে রেখে বিচারকাজ পরিচালনা করবেন। আবার শুধু বিচার করলেই হবে না,  এমনভাবে বিচার করতে হবে যেন সকল পক্ষই নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে, সুষ্ঠু ও নিশ্চিতভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে বিচারপ্রার্থী মানুষের সেবায় আন্তরিকভাবে কাজ করার জন্য আইনজীবীদের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, বিচারপ্রার্থী মানুষের কষ্ট লাঘব করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায় বিজ্ঞ আইনজীবীদের দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।
বার ও বেঞ্চের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং সহযোগিতা একটি সমৃদ্ধ বিচার বিভাগের ভিত্তি গড়ে তুলবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, মামলা জট আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন হবে বারের সক্রিয় সহযোগিতা। বলা হয়ে থাকে বার ও বেঞ্চ একই পাখির দুইটি পাখা। একটির অভাবে অন্যটি অচল। তিনি বলেন, মামলা জট শুধু আদালতের একার সমস্যা নয়। এটি বারের জন্যও অস্বস্তির কারণ। মামলার পাহাড় যত জমতে থাকবে, আদালতের সঙ্গে সঙ্গে বারের প্রতিও বিচারপ্রার্থী মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা কমতে থাকবে। এই সমস্যা সমাধানে বারকেও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, অকারণে মামলা মুলতবির আবেদনের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু এবং ধীরে ধীরে তা বৃদ্ধি করে সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশনের পথে অগ্রসর হতে হবে। ডিজিটাইজেশনের জন্য যে পরিবর্তন হবে তা বারকেও  স্বাগত জানাতে হবে এবং এর বিরোধিতা না করে এর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   জেরুজালেম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঢাকা

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 − seventeen =