ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে’ নতুন পারমাণবিক নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে আগামী ৩০ বছরের জন্য একটি প্রকল্পও অনুমোদন করতে যাচ্ছেন তিনি। এই প্রকল্পে আমেরিকা তার বিদ্যমান পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা না বাড়িয়ে সেগুলোকে অত্যাধুনিক করার পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমেরিকা ও রাশিয়া নিজেদের দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা সর্বনিম্ন সীমায় নামিয়ে আনার জন্য যে চুক্তি করেছিল, তা গতকাল সোমবার থেকে কার্যকর হচ্ছে। আট বছর আগে যখন এটি সই হয়, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্র বড় মাত্রায় হ্রাসের দিকে যাওয়ার জন্য চুক্তিটি ক্ষুদ্র হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকৃতপক্ষে পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন বিশ্ব গড়ার জন্য এটি এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

এখন ওবামার ওই আশাবাদের গণেশ উল্টে গেছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন একটি নতুন পারমাণবিক নীতি প্রণয়ন করেছে। নতুন নীতিতে আমেরিকার লক্ষ্য—রাশিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিপরীতে চুক্তির সীমার ভেতরে থেকেই তাদের পারমাণবিক বোমা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ আধুনিকায়ন।

ট্রাম্পের প্রত্যাশা, পারমাণবিক অস্ত্রের মোট মজুত না বাড়িয়ে পুরোনো অস্ত্রভান্ডারে নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রতিপক্ষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মত, অচিরেই পারমাণবিক অস্ত্র ঘিরে দেশ দুটির মধ্যে নতুন ইঁদুরদৌড় শুরু হতে যাচ্ছে। আর তা হলে স্নায়ুযুদ্ধের দিন পুনরায় ফিরে আসছে নিশ্চিত।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হওয়ার পর গত তিন দশকে পেন্টাগন ধারাবাহিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার হ্রাস করে আসছিল। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার পর পারমাণবিক অস্ত্রের হ্রাসকরণ যে ওই দিনই শেষ সীমায় থেমে গেল, এ বুঝতে রকেটবিদ্যা জানা লোক হতে হয় না।

ট্রাম্প তাঁর কংগ্রেসে দেওয়া ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে রাশিয়া বা পুতিন কারও নাম একবারের জন্যও উল্লেখ করেননি। তাঁর নতুন পারমাণবিক নীতির সাফাই দিতে রাশিয়ার ক্রমাগত পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়নের কথাটিও একবারের জন্য তোলেননি। নতুন পারমাণবিক নীতি বাস্তবায়নের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা যদিও প্রকৃত ব্যয় আরও ৫০০ বিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে ধারণা করছেন।

আরও পড়ুনঃ   আবারো প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়ছেন পুতিন

‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়া ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধের ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস ওই ভাষণের কয়েক দিন আগেই মাত্র ঘোষণা করেছিলেন, আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য সন্ত্রাসবাদী দলগুলো নয়, বরং সামনে দিনে বিশ্বের ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার পথে থাকা বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে যাওয়াই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য থাকবে।

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল ‘নিউক্লিয়ার পশ্চার রিভিউ’ নামে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তাতে দেখা যায়—আমেরিকা সামনের দিনে তীব্রভাবে রাশিয়ার গতিবিধিকে কেন্দ্র করে তার নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঢেলে সাজাবে। তাই এই প্রতিবেদন ট্রাম্পের ভাষণে রাশিয়া নিয়ে নীরবতার উল্টো চিত্রই প্রকাশ করছে।

প্রতিবেদনে রাশিয়ার তৈরি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম নতুন একটি স্বয়ংক্রিয় টর্পেডো (জাহাজ বা সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র) সম্পর্কে কড়া সতর্কতা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। রাশিয়ার এই অস্ত্র তৈরি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেনি। কিন্তু চুক্তির মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়েছে। নতুন টর্পেডোটি প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিতে সক্ষম এবং শনাক্ত করা সম্ভব নয়—এমনভাবে নকশা করা হয়েছে। এর তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের জনজীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে।

প্রতিবেদনে ওবামার সই করা পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসকরণের চুক্তি ২০২১ সালে শেষ হলে নবায়ন করা ঠিক হবে না বলে মত দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে আমেরিকা ও রাশিয়া ১ হাজার ৫০০ পারমাণবিক অস্ত্রের বেশি রাখবে না বলে অঙ্গীকার করেছিল। ওবামার আশাবাদে ইতিবাচক দিক থাকলেও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা আধুনিকায়ন না করাটা ভুল পদক্ষেপ ছিল বলে প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে। রাশিয়া ক্রমেই এই চুক্তি ভঙ্গ করে নতুন নতুন অস্ত্রের উন্নয়ন সাধন করছে বলে আমেরিকা অভিযোগ করে আসছে।

বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতার দিক থেকে রাশিয়া এবং কিছু মাত্রায় চীনের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জে আমেরিকার পিছিয়ে পড়ার অবকাশ নেই—ট্রাম্পের ঘোর সমালোচকেরাও এখন এই মতের পক্ষে। ফলে সামনের দিনে আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্রে রাশিয়া ও চীনকে ছাড়িয়ে যেতে নতুন নতুন গবেষণা, নকশা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এতে বিশ্বে নতুন পারমাণবিক উত্তাপ ছড়াবে, এটি নিশ্চিত করেই বলে দেওয়া যায়।

আরও পড়ুনঃ   ২০১৮ সালে প্রবল ভুমিকম্পের আশঙ্কা!

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

thirteen − nine =