পূর্ববাংলার রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ১৯৪৩ সালেই নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ। ওই বছর মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় ছাপা হওয়া ‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ শীর্ষক এক রচনায় তিনি এই অঞ্চলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে নিজের মনোভাব তুলে ধরেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এটিই ছিল প্রথম পদক্ষেপ। এর পরের বছর কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজ মিলনায়তনে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির সম্মেলনে এক দীর্ঘ ভাষণে বাংলা ভাষার গ্রহণযোগ্য রূপ সম্পর্কে তিনি দীর্ঘ বক্তব্যও রাখেন।
বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে গতকাল শুক্রবার ‘ভাষা আন্দোলন ও আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনের বক্তব্যে এসব তথ্য উঠে আসে। তারা বলেন, বাংলা ভাষা নিয়ে আবুল মনসুর আহমদ গভীরভাবে ভেবেছেন।
ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ সভায় বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পেছনে আবুল মনসুর আহমদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মনসুর মুসা, ড. মো. চেঙ্গীশ খান, ড. আহমদ মাওলা ও ড. মোহাম্মদ আজম। আলোচ্য বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক হাবিব আর রহমান।
তিনি তার প্রবন্ধে বলেন, জাতি, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত ভাবনায় আবুল মনসুর আহমদ আবেগকে অত্যধিক প্রশ্রয় দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে স্ববিরোধের শিকার হয়েছেন। তবে সে জন্য তিনি একা দোষী নন। এটা ছিল কালের প্রভাব এবং তা এতই শক্তিশালী ছিল যে, মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসন প্রসঙ্গে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্রদের মতো মেধাবী ব্যক্তিত্বও এ-সংক্রান্ত বিভ্রান্তি ও স্ববিরোধ এড়িয়ে যেতে পারেননি। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, পিছিয়ে থাকা অনেক ক্ষেত্রে অবজ্ঞাত ও বঞ্চিত নিজের সম্প্রদায়ের মঙ্গল ভাবনায় উজ্জীবিত ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, অবাক হওয়ার মতো বিষয়, আবুল মনসুর আহমদ ১৯৪৩ সালেই পূর্ববাংলার রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ভেবেছেন। জোর দিয়েই লিখতেন যে, বাংলাই হবে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা এবং সে অবস্থান থেকে তিনি
কখনও সরে আসেননি।
সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের চেয়ে ভাষাচিন্তায় আবুল মনসুর আহমদ অগ্রগণ্য ছিলেন বলে মনে করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তার যে অবস্থান, তার প্রমাণ তার লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।
অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেন, আবুল মনসুর আহমদের অবস্থান ছিল রাষ্ট্রভাষা উর্দুর বিপক্ষে। তিনি চেয়েছিলেন বাংলার মানুষ যে ভাষায় কথা বলে সেটাই হবে এখানকার প্রমিত ও রাষ্ট্রভাষা।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

seven + 8 =