আসামের বাঙালিদের পক্ষে মুখ খোলায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আসামের বিভিন্ন জায়গায় মমতার বিরুদ্ধে আন্দোলন, প্রতিবাদ মিছিল, সমাবেশ চলছে। পোড়ানো হচ্ছে মমতার কুশপুতুল।

আসামে বাঙালি হটাওয়ের খবর প্রচারিত হওয়ার পর ক্ষুব্ধ হন মমতা। তাঁর বিরুদ্ধে আসামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন আন্দোলন শুরু করে। পাশাপাশি আসামের বাঙালিরাও প্রতিবাদ জানায়। ফলে অশান্ত হয়ে পড়েছে আসাম।

পশ্চিমবঙ্গের পাশের রাজ্য আসামে গত রোববার গভীর রাতে প্রকাশ করা হয় আসামের রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জির খসড়া। এতে উঠে এসেছে ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের নাম। আসামে নাগরিক পঞ্জির রাজ্য সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা সুপ্রিম কোর্টে আগেই দুই কোটি নাগরিকের আবেদনপত্রের ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। ৩৮ লাখ মানুষের নথিপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকার কারণে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান।

নথি পেশের পর রোববার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের। এই খসড়া প্রকাশের পর নওগাঁসহ বরাক উপত্যকার বাঙালিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দেখা যায়, বহু বাঙালির নাম ওঠেনি। তারা অভিযোগ তুলেছে, বাঙালিদের আসাম থেকে বিতাড়নের পাঁয়তারা চলছে।

আসামের নাগরিক পঞ্জিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ৩ কোটি ২৯ লাখ মানুষ আবেদন করেছিল। এর মধ্যে ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের নাম ওঠে। ১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষের নাম ওঠেনি। ফলে ৫৭ দশমিক ৪১ শতাংশের নাম উঠলেও বাকি থাকে ৪২ দশমিক ৫৯ শতাংশের মানুষের নাম।

এই তালিকা দেখে ক্ষুব্ধ হন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বুধবার তিনি বীরভূম জেলার আমোদপুরে এক সভায় বলেছেন, আসামে এখন বাঙালি খেদাওয়ের পাঁয়তারা চলছে। সেখানে যাঁরা ৩০-৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন তাঁদের নাম ওঠেনি।

মমতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না। আসাম-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে অশান্তি হলে তার প্রভাব পড়বে বাংলায়। আসামে সবাই বাঙালি খেদাও করছে। এটা মেনে নেওয়া হবে না। চক্রান্ত করে মানুষকে নিজের এলাকা থেকে সরানোর নোংরা চেষ্টা করছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।’ এই ঘোষণার পর আসামের ছাত্র সংগঠন আসু, বিজেপি, অগপ, বিপিএফ, অসম যুব-ছাত্র পরিষদ, অহম ছাত্র সংস্থা, সারা আসাম ছাত্র সংস্থাসহ অসমিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মমতার কঠোর সমালোচনা করে মাঠে নেমে পড়েছে। তারা মমতার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে।

আরও পড়ুনঃ   ৫ বছরের বালিকার ৭০ বার অপারেশন!

বিজেপির রাজ্য সভাপতি রঞ্জিত দাসের ভাষ্য, ‘নাগরিক পঞ্জির বিষয়টি কী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা বোঝেন না। যিনি নাগরিক পঞ্জি বোঝেন না, তাঁর আর এক মুহূর্তও গদিতে থাকা ঠিক নয়।’

অগপ সভাপতি অতুল বোরা বলেছেন, অসমের স্থায়ী বাসিন্দাদের ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য নবায়ন করা হচ্ছে নাগরিক পঞ্জি। তাই মমতার প্ররোচনামূলক মন্তব্য মেনে নেওয়া হবে না।

রাজ্যের বিরোধী দলের নেতা দেবব্রত সইকিয়া বলেছেন, ‘নাগরিক পঞ্জি নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করার সাহস কোথা থেকে পেল মমতা? এটা তো সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা।’

এআইইউডিএফ নেতা বদরুদ্দিন আজমল বলেছেন, এ ধরনের মন্তব্য করা, উত্তেজক ভাষণ দেওয়া মমতার উচিত হয়নি।

আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা বলেছেন, মমতার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা উচিত। তখনই মমতা বুঝবেন আদালত অবমাননার ফল কী?

এদিকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল ঘোষণা দিয়েছেন, নাগরিকত্বের সনদ না পেলে আসামে কোনো মৌলিক অধিকার পাওয়া যাবে না। মমতার বক্তব্য বাস্তবতার বিরোধী বলে মনে করেন তিনি। এই নাগরিক পঞ্জিতে বাঙালিরাই উপকৃত হবে বলেও তিনি জানান।

নওগাঁর বাঙালি সম্মেলনের সভাপতি রবিশংকর মজুমদার বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে আসামে বাঙালি-অসমিয়ারা একসঙ্গে বসবাস করছে। মমতার এই মন্তব্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

বৃহত্তর আসাম বাঙালি উন্নয়ন সমিতির সভাপতি অলোক কুমার ঘোষ এবং সাধারণ সম্পাদক সুরেশ সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধিক্কার জানিয়ে বলেছেন, নাগরিক পঞ্জির কাজ যখন চলছে, তখন মমতা এসব মন্তব্য করে আসমিয়া-বাঙালিদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছেন।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 5 =