বড় হচ্ছে দেশের সিরামিক বাজার। উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সিরামিক পণ্যের আমদানি কমছে, বাড়ছে রপ্তানি। প্রতি বছরই এ খাতে নতুন বিনিয়োগ  আসছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিশ্ববাজার দখলে নিয়েছে বাংলাদেশে তৈরি বিভিন্ন সিরামিক পণ্য। সব মিলিয়ে সিরামিক খাতে শক্ত ভিত তৈরি করে নিচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, দেশের মোট রপ্তানিতে সিরামিক পণ্যের গুরুত্ব বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে সিরামিক পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘সিরামিক এক্সপো’-এর উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।
সিরামিক খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশীয় প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের সিরামিক পণ্য উৎপাদন করছে। বিদেশেও বাজার বড় হচ্ছে। তৈজসপত্র পণ্যই বিদেশের বাজারে ব্যাপক চাহিদা। দেশে প্রচুর চাহিদা থাকায় সিরামিক খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে। বর্তমানে প্রায় ৭টি প্রতিষ্ঠান কারখানা নির্মাণ করছে। তবে গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিরামিক পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিসিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, তৈজসপত্র, স্যানিটারি ও টাইলস, এই তিন ধরনের সিরামিক পণ্যের চাহিদার বড় অংশই এখন পূরণ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান। সিরামিক খাতে বর্তমানে ৬২টি প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে তৈজসপত্রের ২০টি, টাইলসের ২৬টি ও স্যানিটারি পণ্য উৎপাদনের ১৬টি কারখানা। সিরামিক পণ্য উৎপাদনে মূল্য সংযোজন ৬৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে সিরামিকশিল্পে ১০০ কোটি ডলার বা ৮,২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ মানুষ খাতটির সঙ্গে জড়িত।
বিসিএমইএ তথ্যমতে, তৈজসপত্র উৎপাদনকারী ২৬ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ কোটি পিস। তারাই তৈজসপত্রের দেশীয় চাহিদার ৮৮.৫৫ শতাংশ পূরণ করে। ২৬টি টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দেশীয় চাহিদার ৭২.২৯ শতাংশ জোগান দেয়। তাদের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১২ কোটি বর্গমিটার টাইলস। স্যানিটারি পণ্যের দেশীয় চাহিদার ৮৩.৪৩ শতাংশ পূরণ করছে ১৬টি স্যানিটারি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বাকিটা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বর্তমানে আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালিসহ বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ কোটি ১৮ লাখ কোটি ডলার বা ৩৩৮ কোটি টাকার সিরামিক পণ্য রপ্তানি করেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এই আয় আগের অর্থবছরের চেয়ে সাড়ে ১৪ শতাংশ বেশি। সিরামিক পণ্যের মধ্যে তৈজসপত্র বেশি রপ্তানি হচ্ছে। গত অর্থবছর ৩৩৮ কোটি টাকার রপ্তানির মধ্যে ছিল তৈজসপত্র ২৮৮ কোটি ও টাইলস ৫০ কোটি টাকার।
বিসিএমইএ সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিন বলেন, সিরামিক পণ্য রপ্তানিতে নেতৃত্ব দেয় চীন। তবে শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে চীনের রপ্তানি কমছে। চীনের বাজার সংকুচিত হওয়ায় আমাদের ক্রয়াদেশ বাড়ছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালের মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের সিরামিক পণ্যের ওপর ৫ বছরের জন্য অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। সেটির সুফল গত বছর থেকে আমরা পাচ্ছি। নতুন নতুন ক্রেতার ক্রয়াদেশ আসছে।
আরএকে সিরামিকস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএকে একরামুজ্জামান বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের সিরামিক পণ্য উৎপাদন করছে। দিন দিন বাজার বড় হচ্ছে। দেশে প্রচুর চাহিদা থাকায় সিরামিক খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে। তিনি বলেন, এ যাবত তার নিজের প্রতিষ্ঠানেই প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এখানে প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করছে বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, এই খাতের রপ্তানিও বাড়ছে। বর্তমানে রপ্তানির বাজার খুবই ভালো। তবে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছ না, ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের কাছে গ্যাসের সমস্যা মেটাতে আবেদন করা হয়েছে। এই সমস্যা সমাধান না হলে সম্ভাবনার এই খাত রুগ্ন হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, এই খাতের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো- চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজজটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ার এটাও একটি কারণ। এছাড়া অনেকেই ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে সিরামিক পণ্য দেশে আনছেন। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা বেকায়দায় পড়ছেন।
জানা গেছে, দেশে সিরামিক খাতের গোড়াপত্তন হয় ষাটের দশকে। প্রথমে এমসিআই ও ন্যাশনাল সিরামিক কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ঢাকা সিরামিক ও তাজমা সিরামিক কারখানা হয়। ১৯৬২ সালে যাত্রা শুরু করে পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ। স্বাধীনতার পর থেকে সেটি পিপলস সিরামিক নামে পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আওতায় মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্যুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি (বিআইএসএফ) হয়। বেসরকারি খাতে প্রথম কারখানা মুন্নু সিরামিক হয় ১৯৮৫ সালে। পরে অনেক উদ্যোক্তা সিরামিক খাতে বিনিয়োগ করেন। উন্নতমানের সিরামিক পণ্য উৎপাদনে মুন্নু, শাইনপুকুর, পিপলস, ফার, প্রতীক, আরএকে, সিবিসি, স্ট্যান্ডার্ড, আবুল খায়ের, ইউরো বাংলা, চারু, মধুমতি, স্টার, প্যারাগনসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ‘সিরামিক এক্সপো বাংলাদেশ ২০১৭’ এর উদ্বোধনকালে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, দেশের মোট রপ্তানিতে সিরামিক পণ্যের গুরুত্ব বাড়ছে। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজন সিরামিক এক্সপো বাংলাদেশ হচ্ছে, এটাই প্রমাণ করে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে এটি বেড়ে চলেছে। বছরে সিরামিক খাত থেকে আমাদের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার।
বিসিএমইএ সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা সিরামিক কারখানায় গ্যাস সংকট ও মালামাল আমদানিতে চট্টগ্রাম বন্দরে সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রীর কাছে এর প্রতিকার চান।
প্রদর্শনীর ফলে নতুন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা এই খাত সম্পর্কে জানতে পারছে বলে মন্তব্য করেন জনপ্রিয় সিরামিক পণ্যের প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুরের সহকারী পরিচালক শহিদুল ইকবাল। ২০০০ সাল থেকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিরামিক পণ্য রপ্তানি করে আসছে শাইনপুকুর সিরামিক লিমিটেড। আমাদের দেশে শ্রমের মূল্য কম, সেই সঙ্গে প্রচুর লোক কাজ করতে আগ্রহী। এ কারণেই আমরা এই শিল্পে অন্য দেশের তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছি বলে মনে করেন শহিদুল।
এদিকে গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সিরামিক মেলার দ্বিতীয় দিনে প্রতিটি স্টলে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। মেলা চলবে আজ বিকাল ৫টা পর্যন্ত। মেলায় দর্শনার্থীদের প্রবেশ উম্মুক্ত। মেলার গোল্ড স্পন্সর হিসেবে রয়েছে আকিজ সিরামিকস, চায়না-বাংলা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সিলভার স্পন্সার ডিবিএল সিরামিকস, মুন্নু সিরামিকস ও প্রতীক সিরামিকস। প্রদর্শনীতে ১৩টি দেশের ৬০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

6 + 15 =