ঋণ বিতরণ বা বিনিয়োগের কতটা করা যাবে ব্যাংকগুলোকে সে বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য এটা করা হয়। ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের মোট আমানতের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। আর অন্যান্য ব্যাংক আমানতের ৮৫ ভাগ ঋণ বিতরণ করতে পারে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড গত বছর বেশ কয়েকবার এ সীমা লঙ্ঘন করেছে। তবে এ সীমা লঙ্ঘনের জন্য গ্রাহককে দায়ী করেছে ব্যাংকটি। আর বিশেষ বিবেচনায় ওই ব্যাংকের জন্য আইডিআর (বিনিয়োগ আমানত হার) সীমা শিথিলের দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, আইডিআর সীমার কারণে ইসলামী ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে থাকে। গতকাল সোমবার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের ব্যাংকটির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরার সময় এসব মন্তব্য করেন ব্যাংকটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা।

নির্ধারিত সীমার বাইরে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয় গত বছরের শেষের দিকে ব্যাংকটিকে সতর্ক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেন, আগ্রাসী ব্যাংকিং করা হয়নি। ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত আমানতের ৮৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। আমরা নিয়ম মেনেই ব্যাংকিং করছি। অন্য ব্যাংকগুলো কত নিয়ম ভঙ্গ করছে তাদের কোনো দোষ নেই। পান থেকে চুন খসলে সব ইসলামী ব্যাংকের দোষ।

তবে ব্যাংকের অপর পরিচালক ও এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন বলেন, আমরা যখন ঋণ দিয়েছি তখন আইনি সীমার মধ্যেই ছিল। কিন্তু আমাদের একজন বড় গ্রাহক তার আমানতের টাকা তুলে নেয়ায় আইডিআরে ঋণ সীমা অতিক্রম করে। একজন গ্রাহক তার আমানত তুলে নিলে আমাদের কিছু করার থাকে না। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেখা উচিত।

তিনি বলেন, আমাদের ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের সীমা বাড়ানো উচিত। এ ব্যাংকের ৭৫ হাজার কোটি টাকা আমানত রয়েছে। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে থাকে। একটি গরিব দেশে এত টাকা অলস ফেলে রাখালে উন্নয়নে তা কাজে লাগে না। এ বিপুল পরিমাণ অলস টাকা বিনিয়োগ করতে পারলে ব্যাংকের আয় আরো বাড়ত। তাই আমাদের ক্ষেত্রে এ সীমা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

আরও পড়ুনঃ   ভ্যাট এলটিইউয়ের ছয় মাসের রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের এমডি আবদুল হামিদ মিঞা বলেন, আমাদের ঋণ আমানত অনুপাত (আইডিআর) সব সময় আইনি সীমা ৯০ শতাংশের নিচে রয়েছে অর্থাৎ ৮৭ কাছাকাছি আছে। তবে সম্প্রতি এটা কিছুটা বেড়েছিল। ৯০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছিল। তবে আমাদের কোনো তারল্য সঙ্কট নেই। আগামীতেও হবে না।

সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সংগৃহীত আমানতের ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংকগুলো ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে পারে। অবশিষ্ট অর্থ নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা অনুপাত (এসএলআর) হিসেবে জমা রাখতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে। তবে ঋণের চাহিদা বেশি হলে এবং ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক সূচক ভালো থাকলে সাধারণ ব্যাংক সেই গৃহীত আমানতের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা যা গত বছরের তুলনায় সাত হাজার ২৪৪ কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে আট হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগসহ মোট সাধারণ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। আমানত বেড়েছে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ঋণ বেড়েছে ১৩.৭০ শতাংশ। গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ২৫ লাখ। গত বছর আমদানি, রফতানি ও রেমিট্যান্স আহরণ বাণিজ্য করেছে যথাক্রমে ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি, ২৪ হাজার কোটি এবং ২৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

চলতি বছর সম্পর্কে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেন, ভবিষ্যতে বড় বড় ব্যাংক থাকবে না। তখন বিকল্প লেনদেনের মাধ্যমেই সব কাজ হবে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসার হবে। ইসলামী ব্যাংকও সেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেট এখন ৫০টি। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মোবাইল ব্যাংকিং এমক্যাশের প্রসারে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, চলতি বছরেই নির্বাচন হবে। তাই আগামী মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির উপর জোর দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে নির্বাচনী বছরে তারল্য প্রবাহ বেড়ে যায়। তাই কিছুটা তারল্যসঙ্কট হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   বাংলাদেশে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ

আবদুল হামিদ মিঞা বলেন, আমরা বড় বড় ঋণ থেকে সরে এসে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) ঋণের দিকে জোর দিচ্ছি। অনেক আগে থেকেই ইসলামী ব্যাংক এসএমই ঋণের উপর জোর দেয়। বর্তমানে এ ব্যাংকের মোট ঋণের ৪৪ শতাংশ এসএমই খাতের। আগামীতে আরো জোর দেয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে অডিট কমিটির চেয়ারম্যান ড. মো: জিল্লুর রহমান, ডাইরেক্টর মো: সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মাহবুব উল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

five × 1 =