তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান। একটি সন্তানের জন্য বুকভরা হাহাকার। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কাতর, সন্তান আসুক সংসারে। এলো না। কী আর করা? একদিনের একটি কন্যাশিশু দত্তক নিলেন। গভীর যত্ন আর মমতায় প্রতিপালন করতে লাগলেন কন্যার। যেমন ভালোবাসেন মা, তেমন ভালোবাসেন বাবা। দরিদ্র মানুষ। ছোট্ট একটুখানি ভিটেমাটি, একটুখানি একটা ঘর। মাঠে বিঘাখানেক ফসলের জমি। সেই জীবনেই মেয়েটিকে বুকে নিয়ে সুখী মা বাবা। নিজেরা খান না খান মেয়েকে তা বুঝতে দেন না। যত্নের অভাব নেই তার। মা বাবার আদরে ৭/৮ বছর বয়স হলো তার। এসময় এলাকার এক প্রভাবশালী যুবক, যে প্রকৃত অর্থে মানুষের মতো দেখতে এক জন্তু। নিজের সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। চোখ পড়ল শিশুকন্যাটির দিকে। সাইকেলে চড়াবার লোভ দেখিয়ে শিশুটিকে সে নির্জনে নিয়ে বদ কর্মটি সমাধা করল। শিশুকন্যা রক্তাক্ত, অসুস্থ হলো। প্রথমে কাউকে কিছু বলল না। দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থবার ঘটল একই ঘটনা। মেয়ে একসময় বাবাকে বলে দিল, মাকে বলে দিল। মা-বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। বিচারের আশায় বাবা দৌড়াতে লাগলেন এলাকার মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছে, প্রভাবশালী লোকদের কাছে। কেউ দাঁড়াল না মানুষটার পাশে। কেউ এগিয়ে এল না তাঁকে সাহায্য করতে। ‘জন্তুটি’ প্রভাবশালী। সে তার প্রভাব বিস্তার করে সব ঠেকিয়ে দিচ্ছে। থানা পুলিশও এগুচ্ছে না বাবাকে সাহায্য করতে। গভীর, গভীরতর অভিমানে বুক ভার হয়ে গেল বাবার। এরকম অনাচারের বিচার পাবেন না তিনি? কেউ এগিয়ে আসবে না তাঁকে সাহায্য করতে? এ কোন সমাজ?

এক সকালে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলেন বাবা। স্ত্রীকে কিছুই বুঝতে দিলেন না। স্ত্রী ভাবলেন নিশ্চয়ই কারো কাছে বিচারের আশায় যাচ্ছেন মানুষটি। ওই ঘটনার পর থেকে এরকম তো প্রায়ই যাচ্ছেন। শিশুকন্যাও নিশ্চয় তাই ভেবেছে।

বিচারের আশায় মানুষটা আজ আর কারো কাছে গেলেন না। মেয়ের হাত ধরে এলেন রেলস্টেশনের দিকে। দূর থেকে এগিয়ে আসছে ট্রেন। মেয়েকে বুকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন বাবা। যে সমাজে এরকম অনাচারের বিচার পাবেন না, বাপ হয়ে রক্ষা করতে পারবেন না কন্যাকে, সেই সমাজে বেঁচে থাকার দরকার কী? মরে যাওয়া অনেক ভালো। গভীর অভিমানে অবুঝ মেয়েটিকে নিয়ে আত্মহত্যা করলেন বাবা। আমাদের অপরাধী করে গেলেন।

ঢাকার এক দরিদ্র এলাকায়, তিন কি চার বছরের শিশুকন্যাটি বাড়ির উঠোন আঙিনায় হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেড়ায়। সেই কন্যাটিকে খাবারের লোভ দেখিয়ে, মুখ চেপে ওই কর্ম করল আর একটি জন্তু। তারপর গলাটিপে হত্যা করে ফেলে রাখল গোসলখানা না টয়লেটে যেন।

এরকম কত ঘটনার কথা বলব?

ভারতে চলন্ত বাসে ওই অপকর্মের ঘটনা ঘটল আর তার হাওয়া এসে লাগল আমাদের দেশে। ও রকম ঘটনা ঘটল বেশ কয়েকটা। বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে আসা কিশোরী মেয়েটিকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে রাতের ট্রাকে তোলা হলো। তারপর ড্রাইভার হেলপার গং মিলে ছ’বার ট্রাকেই ঘটাল ঘটনা।

আর রুপার কাহিনি? চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে রাতের বাসে ফিরছিল রুপা। নিম্নবিত্ত ঘরের অতিকষ্টে উচ্চশিক্ষিত হওয়া মেয়েটির স্বপ্ন ছিল ভালো চাকরি করে সংসারের চেহারা বদলাবে। এ জন্য ছোট চাকরির ফাঁকে আইন পড়ছিল সে। ভালো চাকরির আশায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল অন্য শহরে। রাতের বাসে ড্রাইভার হেলপার আর ৫৫ বছর বয়সী সুপারভাইজার তিনটি পশু অসহায় রুপাকে…। তেমন বেশি রাতও না। এগারোটার মতো বাজে। নানান কায়দায় বাস খালি করেছিল তারা। রুপা একা। অনেক অনুনয় বিনয়, অনেক হাত পায়ে ধরা, অনেক কান্নাকাটি, নিজের মোবাইলটা দিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের, সঙ্গে কিছু টাকা ছিল তাও দিয়ে দিতে চেয়েছিল। রুপার কাকুতি মিনতি, হাত পায়ে ধরে কান্না, কোনো কিছুতেই দমেনি জন্তু তিনটা। সম্ভ্রমহানি তো মেয়েটির ঘটালই, শেষ পর্যন্ত ঘাড় মটকে হত্যা করল রুপাকে। মধুপুরের জঙ্গলে ফেলে দিল তার লাশ। পুলিশ যখন জন্তু তিনটাকে ধরল, তাদের পরিবারের মানুষজন বিস্মিত। এ কী করে সম্ভব? জন্তু তিনটা তো বাসের কাজ শেষ করে সময়মতো বাড়িতে এসেছে এবং প্রতিদিনকার মতো স্বাভাবিকভাবে খাওয়া দাওয়া ঘুম সংসারকর্ম করেছে। তাদের দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, এরকম এক কর্ম করে এসেছে তারা? ওদিকে রুপার সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্ন।

বাংলাদেশে কী এ ধরনের কুিসত ঘটনা আগে এভাবে ঘটেছে? এসব ঘটনার নানারকম মনোবিশ্লে­ষণ করেন অনেকে। বিচারে সাজাও হয় কারো কারো। এই ধরনের ঘটনা ঘটলে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া খুবই সোচ্চার থাকে কয়েকদিন; তারপর সবই থিতিয়ে যায়। আরেকটি ঘটনা ঘটে, আবার শুরু হয় তোলপাড়। কিন্তু ব্যাপারটি তো থামছে না। দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

ঘটনা ঘটবার পর এই সব অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে দেশের মানুষ। কী শাস্তি তাদের হয়? এই জন্তুদের এখনো পর্যন্ত এমন কী শাস্তি দেওয়া হয়েছে যা সত্যিকার অর্থে দৃষ্টান্তমূলক? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তো তাই যা আসলেই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। যে শাস্তির ভয়ে, যে শাস্তির কথা ভেবে ওই জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাবে না মানুষের মতো দেখতে জন্তুরা?

আর একটিও এরকম ঘটনা ঘটুক, দেশের কোনো মানুষ তা চায় না। মানুষ চায়, তার কন্যাসন্তানটি নিরাপদ থাকুক। মানুষ চায় তার মেয়েটি শিক্ষিত হোক, তার স্বপ্ন সফল করুক, মা-বাবার স্বপ্নও পূরণ করুক। দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণের জন্য এইসব জন্তুর সত্যিকার অর্থে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অত্যন্ত জরুরি।

ইমদাদুল হক মিলন
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Comments

comments

আরও পড়ুনঃ   সভ্য যুগেও বিধ্বস্ত মানবতা

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × five =