এতিমখানায় থেকে লেখাপড়া করে এ বছর সরকারি মেডিকেলে চান্স পেয়েছে ভোলার চরফ্যাশনের ছেলে মো: রফিকুল ইসলাম। জীবনে অনেক কষ্টের মুখোমুখি হয়েও পড়ালেখার হাল ছাড়েনি সে। তার ফলস্বরুপ এই মেডিকেলে চান্স পাওয়া। তবে মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন থাকলেও তাকে ভাবাচ্ছে অর্থনৈতিক বিষয়টি।

ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার চর কচ্ছপিয়ার ইউনুস মুন্সির ছেলে মো: রফিকুল ইসলাম। ২০০১ সালে তার বয়স যখন ৬ বা ৭ বছর তখন তার বাবা মারা যান। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সে সবার বড়। বাবার মারা যাওয়ার সময় তার ছোট বোনের বয়স ছিলো মাত্র পাঁচ মাস। বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই নিজেদের বাড়ি থেকে নানাবাড়িতে চলে আসতে হয় তাদের।

২০০৫ সালে সে চরফ্যাশন এতিমখানায় ভর্তি হয়। এ এতিমখানাটি অন্য সব এতিম খানার মত নয়। অন্যান্য এতিমখানায় ছেলেদের থাকা খাওয়া সহ মাদ্রাসা থাকে সেখানে তারা পড়ে কিন্তু চরফ্যাশন এতিম খানা হলো ছাত্রদের থাকা এবং খাওয়া দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে তাদের পড়াশুনা করায়। এই এতিম খানায় থেকেই রফিকুল এইচএসসি পাশ করে।

এতিম খানায় থাকাকালীন উত্তর মাদ্রাজ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এছাড়া ২০১২ সালে চরফ্যাশন প্রি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় এবং একই স্কুল থেকে এসএসসিতে এ প্লাস পেয়ে পাশ করে। এরপর ২০১৬ সালে চরফ্যাশন সরকারি কলেজ থেকে এ প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।

প্রতিটি ক্লাসে পড়ালেখার সময় শিক্ষকবৃন্দ তাকে ফ্রিতে প্রাইভেট পড়িয়েছেন এমনকি কলেজে থাকাকালীনও বিজ্ঞানের বিষয়গুলো স্যারেরা তাকে অত্যন্ত যত্ন করে পড়াতেন।

এইচএসসির পর ঢাকায় একটি মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তি হয়। তবে গত বছর মেডিকেলে চান্স না পেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটে চান্স পায় সে। ‘ঘ’ ইউনিটে ৮২৭ তম হয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। এরপর চলতি বছর দ্বীতিয়বারের মত মেডিকেলে পরীক্ষা দিয়ে ৩৪৪০ তম হয়ে রাঙামাটি মেডিকেলে ভর্তির জন্য সুপারিশকৃত হয়েছে।

এতিমখানা থেকে তাকে প্রতিমাসে দেয়া ৩০০০ টাকা দিয়েই লড়াই করে চলতে হয়েছে তাকে। আর মেডিকেলে চান্স পেয়ে সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে রফিকুল।

মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়ে কেমন লাগছে জানতে চাইলে রফিকুল জানায়, ”গতবছর মেডিকেলে হয়নি কিন্তু ঢাবিতে হয়েছিলো তাতেই আমি খুশি ছিলাম। আর এবার মেডিকেলে হয়েছে এত খুশি হয়েছি যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। দ্বিতীয়বার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিলে ৫ মার্ক কেটে নেয় না হলে সিরিয়ালে আরো আগে আসতে পারতাম।”

ডাক্তার হওয়ার পর কি করার ইচ্ছা আছে জানতে চাইলে কিছুটা আবেগী হয়ে রফিকুল জানায়, ”একবার মা ও ছোটভাই অসুস্থ ছিলো তাদেরকে ৫০০ টাকা নিয়ে চরফ্যাশনে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। একজনের জন্য ডাক্তারের ভিজিট ছিলো ৩০০ টাকা, সে হিসেবে দুইজনের ভিজিট ছিলো ৬০০ টাকা। আমার কাছে ৫০০ টাকা ছিলো বলে শুধু ছোটভাইকে দেখে ডাক্তার বের করে দিয়েছিলো। আমি যদি ডাক্তার হতে পারি তাহলে গরিবদের জন্য জীবনটা বিলিয়ে দেবো।”

মায়ের খুশি সম্পর্কে জানতে চাইলে সে জানায়, আমার মা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। কেননা মামা তাদের বাড়ি থেকে মাকে এবং ছোট বোনকে বের করে দিছে তাকে তার জমি দিবে না এজন্য। এক ব্যক্তি ঢাকায় থাকে আর তাদের বাড়িটা খালি থাকে সেখানে আমার মা ছোট বোনকে নিয়ে বাস করে।

ছোট ভাই মাহবুব আলম এক মসজিদে ইমামতি করে কিছু টাকা পায় তা দিয়েই কোনোরকম চলে মায়ের ও ছোন বোন রাবেয়ার। রাবেয়া এখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। আর মেজ বোন আসমার বিয়ে হয়েছে। সে তার স্বামীর সঙ্গে চট্টগ্রামে এক গার্মেন্টসে কাজ করে।

রফিকুলের বিষয়ে চরফ্যাশন এতিমখানার পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে বিডিলাইভকে তিনি বলেন, রফিকুল আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে। সে অনেক ভালো ছাত্র, আমরা সবসময় তার পাশে আছি। এতিম খানার সকল ছাত্রই আমার সন্তানের মত। তারা ভালো করলে বাবা-মায়ের মতই আমাদের আনন্দ হয়।

সরকারি ও নিজস্ব অর্থায়নে চলা এ এতিমখানায় প্রায় ৮০ জন ছাত্র বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় পড়ালেখা করছে বলে জানান তিনি। এছাড়া রফিকুলের ডাক্তারি পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাধ্যমত তার পাশে এতিমখানা থাকবে বলে জানান তিনি।

ছোট ভাইয়ের অল্প আয় দিয়ে পরের বাড়িতে থাকা মায়ের এবং বোনের চলতে হয়। আর পড়ালেখার কারণে রফিকুল বাড়িতে কোনো টাকা পাঠাতে পারে না। এতদিন সব না হয় চলে আসছে এখন মেডিকেলে ভর্তি ও তার খরচ নিয়ে মহা চিন্তায় পড়েছে সে।

বিত্ত্ববানদের একটু সহযোগীতা পেলে রফিকুলের ডাক্তার হওয়ার পথ কিছুটা মসৃন হত। কোনো প্রকার সাহায্য করতে চাইলে বা তার সাথে কথা বলতে চাইলে তার ব্যক্তিগত নাম্বার ০১৭৭১৩৭৩৫৭২ (বিকাশ) এই নাম্বারে কল দিতে পারেন।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

nineteen − 11 =