নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। গতকাল শনিবারও এসএসসি পরীক্ষার বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) অংশের প্রশ্নপত্র পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা মূল প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায়। যদিও পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করেননি। তাঁরা বলছেন, বিষয়টির খোঁজ নিচ্ছেন।

এসএসসির প্রথম দিন গত বৃহস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্রের এমসিকিউ অংশের প্রশ্নপত্রও পরীক্ষার আগমুহূর্তে ফেসবুকে ছড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেদিন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ফেসবুকে ছড়ানো প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল নেই।

এত উদ্যোগ নেওয়ার পরও এমন অভিযোগে কিছুটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন। গত রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আসলে কী হচ্ছে, ফাঁস হয়ে থাকলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে কি না, বাতিল করলে এর প্রভাব কী হবে—সব বিষয় বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করে দেখতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করার চিন্তাভাবনা চলছে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিতে পারলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকার লেনদেন হচ্ছে কি না, সেটাও নিবিড়ভাবে দেখা হচ্ছে।

এবার সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এসএসসি পরীক্ষা হচ্ছে। ফলে ঝুঁকিও বেশি। এই পরীক্ষায় ১৬ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।

আগে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার দু-এক দিন আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠত। এখন দেখা যাচ্ছে, আগের দিন রাতে যেসব প্রশ্নপত্র ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, তা পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলছে না। কিন্তু পরীক্ষার দিন সকালে পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে যে প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গোপনীয় কিছু গ্রুপে ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তাঁদের ধারণা, পরীক্ষা শুরুর আগে কেন্দ্র থেকে বা উপজেলা থেকে কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র নেওয়ার দায়িত্বে থাকা কোনো অসাধু শিক্ষক বা ব্যক্তি প্রশ্নপত্রের সিলগালা প্যাকেট খুলে তার মধ্য থেকে মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে তা বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

আরও পড়ুনঃ   মাদরাসা শিক্ষাকে জাতীয়করণের আশ্বাস শিক্ষামন্ত্রীর

গতকাল পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আগের দিন রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নপত্র ছড়ানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একজন ব্যক্তি বলেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সকাল ৯টার পর তিনি এমসিকিউ অংশের প্রশ্নপত্র দেখতে পান। পরে দেখা যায়, ওই ব্যক্তির পাওয়া এমসিকিউ অংশের প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল রয়েছে। ওই প্রশ্নপত্র দেখে মনে হয়, প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে সেটি ছড়ানো হয়েছে। তবে আগের দিন রাতে ছড়ানো প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল নেই।

বগুড়া থেকে এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে অভিযোগ করেন, এমসিকিউ অংশের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, একটি অনলাইন পত্রিকার একজন সাংবাদিক এ রকম একটি অভিযোগ জানাতে গতকাল পরীক্ষার আগমুহূর্তে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তাঁর মোবাইল ফোনটি রেখে পরীক্ষা দেখতে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ করতে পারেননি।

পরে জানতে চাইলে তপন কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, সকাল ১০টার দিকে একজন সাংবাদিক তাঁর মোবাইলে ফোন করেছিলেন, কিন্তু ধরতে পারেননি। পরে কথা হয়েছে। ওই সাংবাদিককে ফেসবুকের লিংকসহ তথ্য দিয়ে সহায়তার অনুরোধ করা হয়েছে। এভাবে পরীক্ষার আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁরা খোঁজখবর নিচ্ছেন। এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি। তবে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কর্মকর্তারা বেশ বিব্রত বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।

 কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ও চাকরিতে নিয়োগের পরীক্ষা—সব ক্ষেত্রেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সামনে রেখে বেশ কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেয় সরকার। পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে যাতে প্রশ্নপত্রের মোড়ক না খোলা হয়, সে জন্যও কড়াকড়ি করা হয়েছে। সাত দিন আগে থেকে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করা হয়েছে। ফেসবুক বন্ধেও ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বলেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। এরপরও পরীক্ষার আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠছে।

আরও পড়ুনঃ   খালেদাকে পাল্টা উকিল নোটিশ দেবে আ.লীগ

বিভিন্ন সময় এই ফাঁসের অভিযোগে কিছু ধরপাকড় হলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রকৃত উৎসমূল বের করা যায়নি। এ জন্য মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তা ছাড়া এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাজার উদাহরণ নেই বললেই চলে; বরং গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনিক শাস্তিও নেই বললে চলে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 + 11 =