বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে দিয়েছে শীতের তীব্রতা। পৌষ মাসের মধ্য ভাগেও রোদের তেজই বলে দিচ্ছে ঠাণ্ডার প্রকোপ হ্রাস পেয়েছে। তিন যুগ আগেও পৌষের মধ্য ভাগের ভোরে শীতের কারণে হাড়ে কাঁপন ধরে যেত বলে বয়স্করা মনে করতে পারছেন। তারাই বলছেন, বয়স্কদের শীতের মাত্রা বেশি থাকে কিন্তু এ বছর তেমন ঠাণ্ডা তারা অনুভব করছেন না। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ বছর হ্রাস পেয়েছে শীতের মাত্রা, বেড়েছে উষ্ণতা।

চলতি বছরের মার্চ মাসে যে তাপমাত্রা বেড়েছে তা গত শতাব্দীর গড় মাত্রার চেয়ে বেশি। গত মার্চে ভূমি অথবা সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত তাপমাত্রা বিগত ১০০ বছরের গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইর ইএনএসও অ্যাপ্লিকেশন কাইমেট সেন্টারের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট রাশেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতিফলন ঘটছে। এটা বিশ^ব্যাপী আবহাওয়া পরিবর্তনেও প্রভাব রাখছে। তিনি জানান, গত তিন দশকের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গত শতাব্দীর গড় তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত মার্চে স্থলভাগ ও সমুদ্রে গড়ে তাপমাত্রা বেড়েছে ১.০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১.৮৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। এটা বিংশ শতাব্দীর গড় তাপমাত্রা ১২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি।

ওয়ার্ল্ড ম্যাটিওরলজিকেল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) রিপোর্ট ১৮৮০ সালের পর থেকে ২০১৬ সালকে উষ্ণতম বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ওই বছর বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ প্রতি মিলিয়নে ৪০০ পার্টসের বেশি (প্রতীকী লেবেল) ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ কারণে সমুদ্রে প্রবাল প্রাচীর সাদা (মরে যাচ্ছে) হয়ে যাচ্ছে, স্থলভাগে দেখা দিয়েছে বন্যা, ঝড়, খরা। এ দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে যুক্ত। আর্কটিক অঞ্চলের তাপমাত্রাও অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি, সেখানকার বরফ জমার পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে উষ্ণতার কারণে।

গরম আবহাওয়ার কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশে অনেক দেশের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে গেলে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। অনেক বিরূপ প্রভাবের একটি হলো এ বছরের বিলম্বিত শীত। আগামী জানুয়ারিতে অতীতের মতো ঠাণ্ডা পড়বে কি না তা নিয়েও অনেক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আবহাওয়াবিদরা।

আরও পড়ুনঃ   সাগরে লঘুচাপ ॥ আরও দু’একদিন বৃষ্টি হতে পারে

জাতিসঙ্ঘের আবহাওয়া দফতর (ডব্লিউএমও) ২০১৬ সালে বলেছে, শিল্পায়ন যুগের আগের চেয়ে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ২০১৬ সালে। এতে বলা হয়েছে ১৯৯৮ সালের উষ্ণতম বছর ছাড়া অন্যান্য উষ্ণতার রেকর্ড একবিংশ শতাব্দীতেই ঘটেছে। ১৯৯৮ সালকে অবশ্য আলাদা করে উষ্ণতার বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। কারণ ওই বছর এল নিনুর প্রভাব ছিল সবেচেয়ে বেশি শক্তিশালী। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি বন্যায় তলিয়ে যায়। এক সাথে তিন মাস বন্যার পানি আটকে ছিল সারা দেশে।

চলতি শীত মওসুম সম্বন্ধে বিজ্ঞানী রাশেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য অংশত এল নিনু দায়ী। এ ছাড়া পরিবেশে তাপমাত্রার বৃদ্ধির জন্য মানুষও দায়ী। শিল্পায়নের কারণে তাপ ধরে রাখা পদার্থ কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ।

রাশেদ চৌধুরী বলেন, চলতি শীতে যে কেবল ঠাণ্ডার মাত্রা কম তা নয়। এ শীতে মাঝে মাঝে গড় তাপমাত্রার চেয়ে পরিবেশ একটু বেশিই ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। এ প্রবণতার জন্য গত অক্টোবর থেকে সৃষ্টি হওয়া উইন্টার লা নিনা অর্থাৎ শীতকালীন লা নিনাকেও দায়ী করেছেন রাশেদ চৌধুরী।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, কার্বন-ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলকে গরম করে দিচ্ছে। এটা সমুদ্রের পানিকেও গরম রাখছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের এ উষ্ণ পানি মেরু অঞ্চলের বিশাল বরফ খণ্ডকে গলিয়ে পানিতে পরিণত করে দিচ্ছে। উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনে বেশ প্রভাব ফেলছে। বছরের পর বছর ধরে উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফ শীতকালে পুরো হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে মেরু অঞ্চলে বরফের আস্তরণ শীতকালেও ভারী হচ্ছে না জলবায়ুর তারতম্যের কারণে।

জাতিসঙ্ঘের আবহাওয়া সংগঠনের রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৬ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে বিশাল অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ ছিল। স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো কোনো অঞ্চলের পানি ৫ ডিগ্রি (৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি গরম হয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। এ ধরনের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা পানির ৩০০ মিটার (এক হাজার ফুট) নিচেও বিরাজমান ছিল। এটা হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অস্বাভাবিক প্রবণতার কারণে।

আরও পড়ুনঃ   মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স কর্তৃক সিজার, ভেঙ্গে গেছে নবজাতকের হাত

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

twelve + eleven =