বন্দুকের নলের মুখে নদীর বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কয়েকশ’ নারী। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নড়াচড়া না করতে। উদ্ধত সেনাদের একটি দল এগিয়ে এলো এক তরুণীর দিকে। পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই তরুণীর নাম রাজুমা। কোনোমতে নিজের সন্তানকে উঁচু করে ধরেছেন বুকের ওপরে। রাখাইনে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ায় অন্যদের সঙ্গে পালিয়ে এসেছেন এই তরুণী-মা।
‘তুই’, রাজুমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই ধমকে ওঠে এক সেনা। ভয়ে জমে যান তিনি। আবারও ধমক। এবার নিজের সন্তানকে আরও জোরে বুকে আঁকড়ে ধরেন।
এর পর মুহূর্তের সহিংসতায় আঁধার হয়ে যায় তার চারপাশ। সেনারা লাঠি দিয়ে তার মুখে আঘাত করে। কান্নারত দেড় বছরের সন্তানকে কেড়ে নেয় একটানে, ছুড়ে মারে আগুনে। তারপর এই হতভাগ্য মাকে জোর করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় একটি ঘরে। সেখানে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন সদ্য সন্তান হারানো রাজুমা (২০)।

মিয়ানমারের রাখাইনে এভাবেই নৃশংসতা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে গত বুধবার এক প্রতিবেদনে এমন ভয়ানক নিপীড়নের কথা তুলে ধরেছেন পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জেফরি গেটলেম্যান। তার কাছে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া বর্বরতার কথা জানান রাজুমা নিজেই। সব হারিয়ে তিনি এখন নিশ্চল, নির্বাক। চেনা জগৎ, পরিচিত মানুষজন, আত্মীয়স্বজন, পরিবার ছেড়ে এখন তার ঠাঁই হয়েছে টেকনাফের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে।
বর্তমানে নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়ার ব্যুরো প্রধান জেফরি সম্প্রতি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। গত ১১ অক্টোবর প্রকাশিত ‘রোহিঙ্গা রিকাউন্ট অ্যাট্রোসিটিজ :দে থ্রিউ মাই বেবি ইনটু এ ফায়ার’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়ঙ্কর নিপীড়নের বর্ণনা।

দিনের সূর্য তখন অস্তমিত। নঘ্ন ও রক্তাক্ত শরীর নিয়ে একটি ধানের ক্ষেত দিয়ে দৌড়ে পালান রাজুমা। সন্তান হারিয়েছেন তিনি; হারিয়েছেন মা, দুই বোন ও দুই ছোট ভাইকে। সবাইকে তার চোখের সামনেই হত্যা করা হয়েছে। নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা এ রোহিঙ্গা নারী জানেন না তার অন্য সন্তানের কী খবর, ভবিষ্যৎই বা কী। তার সব হারানোর এ নির্মম কাহিনীই বলে দেয়, আগস্টের শেষদিকে তার গ্রামে কী ঘটেছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যা ও ধর্ষণের মুখে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, সেনারা শিশুদের কুপিয়ে হত্যা করছে, ছেলেদের দেহ থেকে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করছে। এভাবেই নৃশংসতম জাতিগত নিধন চালাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
বুধবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বেঁচে থাকা রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে ধর্ষণ ও অন্যান্য মানসিক আঘাত করার মতো কৌশল অবলম্বন করছে। তারা বাড়িঘর, ক্ষেত ও গৃহপালিত পশু পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা যেন ফের রাখাইনে ফিরতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতেই সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবেই এসব বর্বরতা চালাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনারা একটি লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। তা হলো, পুরো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। জাতিসংঘ মিয়ানমারের এ সামরিক অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনের প্রামাণ্য উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রবীণ তদন্তকারী পিটার বুকায়ের্ট জানান, রাখাইনে সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটছে। একটি এলাকায় সেনারা পরিকল্পিতভাবে শতাধিক বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। এ রকম একটি হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গেছেন রাজুমা। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

5 × four =