তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আরও সাড়ে চারশ কোটি ডলার (প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নিতে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এ অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ, রেলপথ, সড়ক, জাহাজ চলাচল, বন্দরসহ অবকাঠামো খাতে ১৭ অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ে ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উপস্থিতিতে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অবশ্য চুক্তি স্বাক্ষরের আগে উভয় দেশের অর্থমন্ত্রী বৈঠক করেন। এর পর অর্থ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে বেলা ১১টায় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটে (এলওসি) আগের মতোই কঠিন শর্ত থাকছে।বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শফিকুল আযম এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রাসকিনহা এ চুক্তিতে সই করেন।

চুক্তি স¦াক্ষর অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মুসলিম চৌধুরী শিল্প সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।গত মাসে তৃতীয় এলওসি ঋণের শর্তাবলি প্রস্তাব আকারে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠায় ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক। একই সঙ্গে নতুন শর্তগুলো এমওইউতে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ আপত্তি জানানোয় শেষ পর্যন্ত তৃতীয় এলওসির নতুন শর্ত নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে বলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান।অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র জানায়, ১০০ কোটি ডলারের প্রথম এলওসি এবং ২০০ কোটি ডলারের দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যে যে শর্ত ছিল তৃতীয় এলওসির ক্ষেত্রেও প্রায় একই শর্ত রাখতে চায় ভারত। ভারতের প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়, আগের দুই এলওসির মতো নতুন এলওসির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যত ধরনের পণ্য, সেবা, যন্ত্রপাতি কিংবা উপকরণের প্রয়োজন হয়, তার মোট মূল্যের ৭৫ শতাংশই ভারত থেকে সংগ্রহ করতে হবে। বাকি ২৫ শতাংশ পণ্য ও সেবা বাংলাদেশ থেকে নেওয়া যাবে। এ ছাড়া ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে সব সংবিধিবদ্ধ বা বিধির অনুমোদন নিতে হবে।প্রথম ও দ্বিতীয় এলওসির মতো তৃতীয় এলওসিতে সুদের হার ১ শতাংশ রাখা হয়েছে। পাঁচ বছরের রেয়াতি কালসহ এ ঋণ ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। গ্রেস পিরিয়ডের সময় সুদ গুনতে হবে না। এর পর থেকে মূল টাকার পাশাপাশি সুদ পরিশোধ শুরু করতে হবে। তবে এর সঙ্গে ছাড় না হওয়া অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমিটমেন্ট ফি দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বাড়তি দুই শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হবে। নতুন এলওসির ক্ষেত্রে ঋণচুক্তির পর থেকে ৪৮ মাসের প্রকল্পের দরপত্রসংক্রান্ত কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে ৭২ মাসের মধ্যে এলওসিভুক্ত প্রকল্পের পণ্য সরবরাহ কাজ শেষ করার নিয়ম করে দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।চুক্তি স্বাক্ষরের পর অরুণ জেটলি বলেন, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রথম বাংলাদেশে এসে আমি আনন্দিত। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশেষ করে আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে পর্যালোচনা করেছি, যা সম্প্রতি বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যা সম্প্রতিকালে ক্রমবর্ধমান। ভারতের স্বার্থে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আমরা বাংলাদেশের উন্নয়নে আগেও পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। তারই ধারাবাহিকতায় এ বড় অঙ্কের ঋণচুক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অন্য দেশের জন্য তা একটি মডেল।অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে। ভারতের অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর এটি। এর আগে দুটি এলওসি পেয়েছি। এটি তৃতীয় এলওসি। উভয় দেশ পারস্পরিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় তারা বাংলাদেশের পাশে ছিল। আগামীতেও আমাদের পাশে থাকবে বলে আশা করছি। চলতি বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় বাংলাদেশের জন্য এই সাড়ে চারশ কোটি ডলার ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় অর্থমন্ত্রীর এবারের সফরে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলো।ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, আগের দুটি এলওসিতে মোট ৩০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। গত জুন মাস পর্যন্ত প্রথম এলওসির মাত্র ৩৫ কোটি ডলার ছাড় হয়। প্রথম এলওসির ১৫ প্রকল্পের মধ্যে আট প্রকল্প শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় এলওসির কোনো প্রকল্পে অর্থ ছাড় হয়নি।ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ঋণচুক্তি হওয়ার পর প্রকল্প চূড়ান্ত করতেই বেশ সময় লাগে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রকল্প অনুমোদন হয়ে ফেরত আসতেও সময় কেটে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের দিক থেকে সমস্যা হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়াসহ এসব প্রাথমিক কাজ করতেও কালক্ষেপণ হয়। ফলে একদিকে যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় না। আবার ব্যয়ও বেড়ে যায়।২০১০ সালের ৭ আগস্ট দুই দেশের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের প্রথম এলওসি ঋণচুক্তি হয়। ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ২০০ কোটি ডলার ঋণ বা দ্বিতীয় এলওসি দেওয়ার সমঝোতা চুক্তি হয়। পরে ২০১৬ সালের মার্চে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়। এ ঋণের আওতায় ১৪ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় বাংলাদেশ।জানা গেছে, তৃতীয় এলওসির অর্থ দিয়ে ১৭ প্রকল্প করার প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছে বাংলাদেশ। তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলো হলোÑ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন; পায়রা বন্দরের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ; বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার ও তীর সংরক্ষণ; বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ; সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন; বেনাপোল-যশোর-ভাটিয়াপাড়া-ভাঙ্গা সড়ক চার লেনে উন্নীত; চট্টগ্রামে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ; ঈশ্বরদীতে কনটেইনার ডিপো নির্মাণ; কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরি; মোংলা বন্দর উন্নয়ন; চট্টগ্রামে ড্রাই ডক নির্মাণ; মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত চার লেনে সড়ক উন্নীত; মোল্লাহাটে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ; মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন; কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর হয়ে সরাইল পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ; ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে এক লাখ এলইডি বাল্ব সরবরাহ প্রকল্প। কোনো ঋণচুক্তির আওতায় এটিই হচ্ছে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বড় ঋণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে এক হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের (বাংলাদেশের টাকায় যা প্রায় ৯২ হাজার কোটি) ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ।অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দুই দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সুরক্ষার চুক্তির ওপর যৌথ ব্যাখ্যামূলক নোটগুলো ও স্বাক্ষর হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে শিল্প সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ স্বাক্ষর করেন।বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, অর্থায়নে আমাদের সমস্যা নেই। অনেক প্রতিশ্রুতির অর্থ আমাদের রয়েছে। অন্য প্রকল্পের মতো এখানেও সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে জমির স্বল্পতা অন্যতম। তিনি বলেন, আমাদের প্রকল্প প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। দক্ষতা না বাড়ালে খুব বেশি লাভ হবে না। এ জন্য প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে নেগোসিয়েশন প্রয়োজন। কারণ ঋণের টাকা পেতে চুক্তি হয়েছে। টাকা ছাড়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নেগোসিয়েশন করার পরামর্শ দেন তিনি।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

seventeen + five =