মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও বাংলাদেশে ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমনে সৃষ্ট সংকট আলোচনার জন্য আজ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে তার মূল্যায়ন তুলে ধরবেন। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য না হলেও বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত প্রতিনিধি বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরবেন।

২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা ও রোহিঙ্গা
\হউচ্ছেদ শুরু হলে ইতিমধ্যে দুই দফা নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আলোচনা \হহয়েছে। দ্বিতীয় বৈঠকে নিন্দা জানিয়ে সহিংসতা বন্ধ করা এবং রাখাইনে আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের কাজ করতে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হলেও মিয়ানমারের সাড়া মেলেনি। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার মুখে পরিষদের ১৫ সদস্যের ৯টি দেশের অনুরোধে আজকের আলোচনা বসছে। বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে ৫ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এবং অস্থায়ী সদস্যদের মধ্যে মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেন।

২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে যে পাঁচটি প্রস্তাব করেছেন তাই হবে নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের অবস্থানের ভিত্তি। মিয়ানমারের একজন প্রতিনিধিকেও বক্তব্য রাখার জন্য বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র। বাংলাদেশের স্থানীয় সময় রাত ১২টায় এ বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
আশা করা হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারকে কঠোর বার্তা দিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি গ্রহণ করা হতে পারে। বাইরে থেকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি জানালেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব ওঠার সম্ভাবনা নেই। কারণ সে রকম প্রস্তাবে চীন বা রাশিয়া ভেটো দিলে তা অর্থহীন হবে।

পরিষদের বৈঠক সামনে রেখে গতকাল বুধবার ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও পরররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রদূতদের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনযজ্ঞ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সম্পর্কে সর্বশেষ পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। রাষ্ট্রদূতদের ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গা সংকটে সব দেশের পক্ষ থেকেই বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে সকালে ঢাকা সফররত জাপানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আইওয়াও হরি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, জাপানও বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূমিক কী হবে :সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর গণনিষ্ঠুরতা বন্ধে এর আগে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানোর পরও মিয়ানমার সেসব আহ্বান কার্যত আমলে নেয়নি। মিয়ানমার অসত্য তথ্য দিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের এক ধরনের অবজ্ঞার জের ধরেই নিরাপত্তা পরিষদের আজকের বৈঠকের আহ্বান। এর ফলে নিরাপত্তা পরিষদের এবারের বৈঠক থেকে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কঠোর ভাষায় রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে বলে বিবৃতি দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মিয়ানমারের অপপ্রচারও আর গুরুত্ব পাচ্ছে না।

নিউইয়র্ক সূত্র জানায়, নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স দৃশ্যত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষুব্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব দেশের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, মনোভাব এবং মিয়ানমারকে দেওয়া কূটনৈতিক বার্তা থেকে এ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও চীন মিয়ানমারের পক্ষে থাকছে। নিউইয়র্ক সূত্র জানায়, অবশ্য সম্প্রতি চীনের এক বার্তায় বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার কারণে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাচ্ছে না এমন কথাও বলা হয়েছে।
নিউইয়র্কের কূটনৈতিক সূত্রের মতে, এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ থেকে মিয়ানমারের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা আসতে পারে। এ ধরনের সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া আপত্তি করবে না। কিন্তু এর চেয়ে কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সে ক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া আবারও ভেটো দিতে পারে।

নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জাপানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত তাদের নীতি অনেকটাই দ্বিমুখী। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উভয় দেশকেই সন্তুষ্ট রাখার কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে তারা এগোচ্ছে। সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বাংলাদেশের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে জাপানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে জাপানকে এটাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদে জাপানের সমর্থনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছিল। ফলে বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে সংকটে যৌক্তিক ও মানবিক অবস্থানই আশা করে।

\হএর বাইরে নিরাপত্তা পরিষদের মিসর, ইতালি, সুইডেন এরই মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণনিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে জোর আহ্বান জানিয়েছে। অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র বলিভিয়া, উরুগুয়ে, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও ইউক্রেনের অবস্থানও মিয়ানমারে গণনিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধেই থাকবে, এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং :গতকাল বুধবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, ব্রিফিংয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঢাকায় দূতাবাস আছে এমন নয়টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই একই মত দিয়ে বলেছেন যে, তারা রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল। তিনি বলেন, তাদের জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যাশা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যেন প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা দ্রুত নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে।

তিনি আরও জানান, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি বক্তব্য রাখবেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের বক্তব্যে বিশ্বনেতাদের সামনে পাঁচ দফা তুলে ধরেছেন। এই পাঁচ দফা সামনে রেখেই বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরা হবে।
মিয়ানমারের নাগরিক শনাক্ত প্রশ্নে :পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করা সাপেক্ষে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এই শনাক্তকরণের দায়িত্ব জাতিসংঘ পালন করুক সেই প্রস্তাব দিয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কেও বাংলাদেশ এই প্রস্তাব জোরালোভাবে তুলে ধরবে। এ প্রস্তাবে জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দল মিয়ানমারের নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত করবে এবং সে অনুযায়ী তাদের নির্বিঘ্নে মিয়ানমারে ফেরত নিতে হবে সেই প্রস্তাবই বাংলাদেশ দিয়েছে।

ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বল প্রয়োগের মুখে প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
চীনের প্রতি মালয়েশিয়া :রোহিঙ্গা সংকটে চীনকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউ স্ট্রেইট টাইমসের এক খবরে এ কথা বলা হয়েছে।
পত্রিকাটি জানায়, চীনের রাজনৈতিক ও আইনবিষয়ক সচিব মেং হিয়ানঝুর সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে এ আহ্বান জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ড. আহমেদ জাহিদ হামিদি। বৈঠকে মেং বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কাছে এক কোটি ডলারের খাদ্য, বিভিম্ন সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তাতে চীন সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন মেং। সংকট সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি দু’পক্ষের মাঝে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে চীন।
আসিয়ানে মতৈক্য :অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত সব সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক পথে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ব্যাপারে একমত হয়েছে আঞ্চলিক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পর গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাক্রিশনান এসব কথা জানান।

দেশটির একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে আঞ্চলিক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আলোচনায় তিনটি বিষয়ে পরিস্কার ঐকমত্য হয়েছে। প্রথমত, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এবং তা এখনই করতে হবে। সব সম্প্র্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা প্রয়োজন বলেও দেশগুলো একমত হয়েছে। এ লক্ষ্যে আসিয়ান হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্স সেন্টার খোলা হয়েছে। তাছাড়া আঞ্চলিক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়েও সম্মত হয়েছে।
এর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের দেওয়া বক্তব্য থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে মালয়েশিয়া। এ প্রসঙ্গে গত সোমবার মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি আনিফা আমান বলেন, আসিয়ানের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। বিবৃতিতে আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে কোনো কথা বলা হয়নি।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 − twelve =