কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় সারা দেশে শোক দিবস পালিত হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিহত ও আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে পুরো দেশ। শোকের দিনে দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া শাহরিন আহমেদ গতকাল দেশে ফিরেছেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া  আরো তিনজন আজ দেশে ফিরছেন। গুরুতর আহত ডা. রেজওয়ানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছে সিঙ্গাপুর।

এদিকে নিহতদের লাশ পেতে স্বজনেরা অপেক্ষায় থাকলেও যাদের লাশ শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট করতে হবে তাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েকদিন।
ওদিকে গতকাল বাংলাদেশের চিকিৎসক দল নেপাল পৌঁছে কাজ শুরু করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেয়া এবং নিহতদের লাশ শনাক্তে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহে কাজ করবেন বলে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। এদিকে দুর্ঘটনার বিষয়ে পুরো তদন্ত শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। সংস্থার চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান গতকাল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সাধারণ এমন ঘটনায় তদন্তে এক বছর লাগে। এ ঘটনায় এর চেয়ে বেশি সময়ও লাগতে পারে।

নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাস সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে, নিহত ১৯ জনের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বাকিদের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে আহত ১০ বাংলাদেশির মধ্যে এক জনের অবস্থা গুরুতর ও বাকি ৯ জনের অবস্থা স্থিতিশীল। বুধবার রাতে ডা. রেজওয়ানুল হককে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন আরো ছয় জনকে কাঠমান্ডু ছাড়ার অনাপত্তিপত্র দেয়া হয়েছে।

গতকাল বিকালে নেপালের কাঠমান্ডুতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সেখানকার রাষ্ট্রদূত ও অবস্থানরত চিকিৎসক ও সিআইডি দলের সদস্যরা। সেখানে বাংলাদেশি চিকিৎসকরা বলেন, রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কার কী অবস্থা তাও জানা গেছে। প্রায় সবার অবস্থা স্থিতিশীল। নেপালের চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে দেশে নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা চিকিৎসক দল দু’ভাগ হয়ে কাজ করবো। একদল রোগীর চিকিৎসায় নেপালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করবেন। আমরা ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা লাশের ময়নাতদন্তে কাজ করবো। তবে এ ক্ষেত্রে এদেশের (নেপাল) আইন মেনে এখানকার চিকিৎসকদের সঙ্গে সহযোগী হয়ে কাজ করা হবে। আর লাশ শনাক্তে ডিএনএ টেস্টের জন্য নমুনা হিসেবে চুল, হাড় বা শরীরের প্রয়োজনীয় অংশ সংগ্রহ করা হবে। সিআইডির প্রতিনিধি বলেন, আমরা লাশের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাব। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে প্রত্যেক লাশ শনাক্ত করা হবে। তারপর দগ্ধ লাশগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে। এজন্য কিছু দিন সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুনঃ   খালেদা জিয়ার মামলার পরবর্তী যুক্তিতর্ক ৩ ও ৪ জানুয়ারি

তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগবে: ফ্লাইট বিএস-২১১ বিধ্বস্তের ঘটনা তদন্তে ১ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান। গতকাল দুপুরে বেবিচকের কনফারেন্স রুমে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নাইম হাসান এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্লেন দুর্ঘটনা তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। দুর্ঘটনার পর থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। কিন্তু এটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ব্ল্যাক বক্স বা ফ্লাইটের ডাটা রেকর্ডার কানাডায় পাঠানো হবে, ইকুপমেন্ট টেস্টের বিষয় আছে। ৩৬৫ দিনও লাগতে পারে, তবে ফিক্সড কোনো সময় নেই। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাইম হাসান বলেন, ঘটনা যেহেতু নেপালে ঘটেছে, সে হিসেবে তদন্তের এখতিয়ার পুরোপুরি নেপালের। আমরা সহযোগিতা করতে পারি, আমাদের টিম আসা-যাওয়া করবে।

তিনি জানান, বেবিচকের পক্ষ থেকে নেপালে পাঠানো টিম জানিয়েছে, বিএস-২১১ উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মরদেহের ময়নাতদন্ত  সম্পন্ন হয়েছে। ৪-৫ দিনের মধ্যে বাকিগুলোর হয়ে যাবে আশা করছি। এরপর থেকে আহতদের সঙ্গে দু’একটা করে মরদেহ আসতে থাকবে। তখন সেখানে বেবিচকের পরিচালক (ফ্লাইট সেফটি) চৌধুরী জিয়াউল কবির ও সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালনা) মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল রাজধানীর বারিধারায় ইউএস-বাংলা কার্যালয়ে বিমান সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রেজওয়ানুল হক নামের অপর একজনকে ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাকি দুইজনকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা চলছে।

এর মধ্যে শাহরিন আহমেদকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ঢাকায় আনা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে তাকে সরকারি খরচে সকল চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে। মো. রেজওয়ানুল হককে তার বাবা মো. মোজাম্মেল হক সিঙ্গাপুরে নিয়ে যান। ইয়াকুব আলী ও এমরানা কবির হাসিকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হবে। বাকিদেরও যেকোনো সময় বাংলাদেশে নিয়ে আসা হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   জনজীবনে রোহিঙ্গাপ্রভাব

এছাড়া গুরুতর আহত মো. শাহীন ব্যাপারী কাঠমান্ডু মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে এবং মো. কবীর হোসাইন ও শেখ রাশেদ রুবায়েত একই হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের এখনো নেপালের হাসপাতাল ছাড়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

শাহরিন শঙ্কামুক্ত:  কাঠমান্ডু থেকে জীবন নিয়ে ফেরা শাহরিন আহমেদের শারীরিক অবস্থ স্থিতিশীল এবং তিনি শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা। তারা জানিয়েছেন, শাহরিনের শরীরের পাঁচ শতাংশ ডিপবার্ন হয়েছে। বিকালে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসচিব সিরাজুল হক খান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাছির উদ্দিন, বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবুল কালাম, সাজ্জাদ খন্দকার প্রমুখ। শাহরিনকে বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করানোর পর সামন্তলাল বলেন, শাহরিনকে বার্ন ইউনিটের ৫ নম্বর বেডে রাখা হয়েছে। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। তিনি বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মতো এত বড় একটি দুর্ঘটনার ধকল শাহরিনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। তাই তিনি মেন্টালি ট্রমায় রয়েছেন। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। শরীরের ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। এ ছাড়া ডান পায়ে আঘাত রয়েছে। আহত শাহরিনের ভাই লে. কর্নেল সরফরাজ আহমেদ বলেন, শাহরিনের ডান পায়ের একটি হাড় ভেঙ্গে গেছে। তবে সে সাপোর্ট নিয়ে হাঁটতে পারে। অন্যদের তুলনায় তার শরীরের অবস্থা এখন অনেক ভালো। বিমান দুর্ঘটনার ঠিক আধা ঘণ্টা পরে শাহরিন নিজেই আমাকে ফোন করে তার আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে বলে জানান সরফরাজ। শাহরিন বলেছিলেন, ভাইয়া নেপালের সেনাবাহিনীর লোকেরা যদি আমাকে সাহায্য না করতেন তাহলে হয়তো আমিও অন্যদের মতো মারা যেতাম। সরফরাজ বলেন, এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় শাহরিনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করেছে। দুর্ঘটনার সময় শাহরিনসহ আরো যারা সামনের সিটে বসেছিলেন তারা সবাই বেঁচে গেছেন। ঢাকার স্কলাস্টিকার জুনিয়র প্রোগ্রামার শাহরিন তার বন্ধুদের সঙ্গে একটি প্যাকেজ ট্যুরে নেপাল বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে গতকাল বিকাল ৩টা ৪৮ মিনিটে কাঠমান্ডু থেকে ফেরেন শাহরিন। সঙ্গে ছিলেন তার দুই ভাই। শাহরিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য হাসপাতালের একটি দল আগে থেকেই বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতাল থেকে শাহরিনের বিদায়ের সময় সেখানকার চিকিৎসক ও নার্সরা তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। নেপালের ঐতিহ্য অনুযায়ী তাকে উত্তরীয় পরিয়ে ফুল উপহার দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম।

আরও পড়ুনঃ   এখনো থামেনি রোহিঙ্গা নিধন- একমাসে এসেছে পাঁচ লাখ আন্তর্জাতিক চাপ আমলে নিচ্ছে না মিয়ানমার

এদিকে ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তে ২৬ বাংলাদেশিসহ নিহত ৫১ জনের স্মরণে গতকাল সারা   দেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়েছে। নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করতে কালো ব্যাচ ধারণ করে মানুষ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্ধনমিত রাখা হয় জাতীয় পতাকা। পাশাপাশি কালো পতাকাও উড়ানো হয়। আজ শুক্রবার সারা দেশের মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনা করার কর্মসূচিও রয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × 5 =