প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে সময়মতো ঋণ বিতরণ ও আদায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নানান উপদেশ দিয়ে থাকেন। অথচ তিনি নিজে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছেন না। ঋণের টাকা আদায়ের জন্য বছরের পর বছর ধরে প্রায় এক ডজন ব্যাংক তার পেছনে ঘুরছে। সর্বশেষ তথ্য মতে, ১১ ব্যাংকের ঋণখেলাপির তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তার। ঋণের টাকা চাইলে উল্টো সংশ্নিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের শাসাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু ব্যাংক নয়, তার পেছনে ঘুরছেন সহকর্মীরাও। নানা কৌশলে সহকর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছেন না। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া অফিসের মহাব্যবস্থাপক। গত মার্চে ওই অফিসে যোগদানের আগে প্রধান কার্যালয়ের কৃষিঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। ওই সময়ে কৃষিঋণ বিভাগসহ বিভিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকার বেশি ধার নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসবের বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই তার হাউস বিল্ডিং ও গাড়ি কেনার জন্য এক কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে।
এই লাখ লাখ টাকা নিয়ে তিনি কী কাজে ব্যয় করেছেন, তা সহকর্মীদের বেশিরভাগই জানেন না। সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেওয়ার বিষয়ে জানা গেছে, অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে জমি ক্রয়, কিংবা কিছুদিনের জন্য ধারের কথা বলে এই টাকা নিয়েছেন তিনি। যার বেশিরভাগই
তিনি ফেরত দিচ্ছেন না। বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো সুরাহা না পাওয়ায় সহকর্মীরা এখন ক্ষুব্ধ। আর ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে এক ব্যাংকের ঋণের তথ্য আরেক ব্যাংকে গোপন করেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় ঋণদাতা ব্যাংকগুলোও বিষয়টি ততটা যাচাই করেনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক সমকালকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে তিনি ঋণগুলো সময়মতো পরিশোধ করতে পারেননি। তবে সমস্যার মধ্যেও বেশ কিছু ঋণ তিনি পরিশোধ করেছেন। বাকি ধারদেনাও তাড়াতাড়ি পরিশোধ করবেন। পাওনাদারদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে সময়মতো ঋণ আদায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা হিসেবে কেন এই অনিয়ম করছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দু-একটা ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। আমি কাভার দেওয়ার চেষ্টা করছি।’ বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় কিছু না লেখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সেটেল করছি। তাড়াতাড়ি সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই শেষে ১৫টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১১টি ব্যাংকের ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৮৬ টাকা এখন মন্দমানের খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এসব ঋণের বেশিরভাগই নিয়েছেন বেতনের বিপরীতে ক্রেডিট কার্ড বা ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে। এ ছাড়া তার ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য একজনের নামে আরও এক লাখ ৮৬ হাজার টাকার ঋণ রয়েছে। মন্দমানে শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে তিন দফায় নেওয়া দুই লাখ ৩০ হাজার, চার লাখ ৬০ হাজার ও দুই লাখ ১৮ হাজার টাকা। পূবালী ব্যাংক থেকে দুই দফায় নেওয়া তিন লাখ ৮১ হাজার। একই ব্যাংক থেকে নেওয়া এক লাখ ১৪ হাজার টাকার অন্য একটি ঋণ সন্দেহজনক মানে শ্রেণিকৃত। প্রাইম ব্যাংকের ছয় লাখ ৪৯ হাজার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ছয় লাখ ১৮ হাজার, ন্যাশনাল ব্যাংকের পাঁচ লাখ আট হাজার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের তিন লাখ ২০ হাজার, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের দুই লাখ ৫৭ হাজার, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দুই লাখ ২৩ হাজার এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের এক লাখ ৪১ হাজার টাকা এখন মন্দমানে শ্রেণিকৃত।

কিছুদিন আগে ইস্টার্ন ব্যাংকে তিনি ১০ লাখ টাকার বেশি পরিমাণের ঋণখেলাপি ছিলেন। তবে সম্প্রতি কিছু টাকা দিয়ে পুনঃতফসিল করায় তা কমে আট লাখ ৯৩ হাজার টাকায় নেমেছে। এই ঋণ এখন নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকে তিনটি ঋণের মধ্যে চার লাখ ৪১ হাজার টাকার একটি ঋণ এখন সন্দেহজনক মানে শ্রেণিকৃত। আর এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা সাব-স্ট্যান্ডার্ড এবং এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা ঋণের তিনি গ্যারান্টার। এ ছাড়া এনসিসি ব্যাংকের চার লাখ ৫৬ হাজার ও মেঘনা ব্যাংকের এক লাখ ১৪ হাজার টাকা সন্দেহজনক মানে শ্রেণিকৃত। আর এবি ব্যাংকে সাত লাখ ৬১ হাজার, উত্তরা ফাইন্যান্সের সাত লাখ ৫০ হাজার ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পাঁচ লাখ টাকা নিয়মিত রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সমকালকে বলেন, তার ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়ে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেনি। আর সহকর্মীদের থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে শুনলেও কারও কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাননি। তিনি জানান, চাকরিতে থাকা অবস্থায় অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মকর্তা ঋণ নিতে পারেন না। এসব ঋণে অনুমতি আছে কি-না তা ঠিক জানি না। তদন্ত পর্যায়ে গেলে বোঝা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ব্যাংক-কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানির পরিচালক বা এমডি হতে পারেন না। ঋণখেলাপিরা দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্যও অযোগ্য। মূলত খেলাপিদের সামাজিকভাবে চাপে রাখতে আইনে এ রকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এসব বিষয় দেখভাল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও খেলাপি এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা চাকরিতে থাকতে পারেন কি-না সে বিষয়ে আইনে কিছু উল্লেখ নেই। তবে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার দায়ে চাকরি চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। প্রভাষ চন্দ্র মল্লিকের এসব ঋণে অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। সূত্রঃ

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

five × 5 =