বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণাকে ঘিরে উত্তপ্ত রাজনীতির ময়দান। রায় ঘোষণার আগেই শঙ্কা প্রকাশ করে বিএনপি নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাদের অভিযোগ সরকারের ছকেই রায় ঘোষণা হবে। এমন হলে সারা দেশে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার মামলাটি আদালতের বিচার্য বিষয়। আদালতে নির্ধারিত হবে তিনি দোষী না নির্দোষ।

এ নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করার কিছু নেই। তারা এও বলছেন, বিএনপি রায়কে ঘিরে ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচিতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে। দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে প্রয়োজনে
আওয়ামী লীগও রাজপথে থাকবে। আগামী ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। মামলার শুনানিতে খালেদা জিয়ার যাবজ্জীবন সাজা চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ন্যায় বিচার পেলে তিনি অভিযোগ থেকে খালাস পাবেন।
কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাবে বিএনপি: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গেলে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাবে বিএনপি। রায়কে সামনে রেখে দলটিতে চলছে দুই ধরনের প্রস্তুতি। রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি দলটির নেতাকর্মীরা সর্বাত্মকভাবে নামবে রাজপথে। কেন্দ্রের কর্মসূচির অপেক্ষায় থাকবে না তৃণমূল। কৌশলগত কারণে কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির ঘোষণা না এলেও করণীয় সম্পর্কে বিশেষ কিছু নির্দেশনা দেয়া হবে তৃণমূলে। আগামী ৮ই ফেব্রুয়ারি মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার পর এমন মনোভাব প্রকাশ করেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম থেকে নানা পর্যায়ের নেতারা। এদিকে মামলার রায়কে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে শনিবার ও বৃহস্পতিবার দুই দফা বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন দফায় দফায়। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতারা একের পর এক বৈঠক করছেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে। এসব বৈঠকে রায়-পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে মতামত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতারা কিছু বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছেন তৃণমূলে। ওদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার দলের নীতি নির্ধারক ফোরাম স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন খালেদা জিয়া। রাতে তার গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। বৈঠক সম্পর্কে দলের স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, ট্রাস্ট মামলার রায়কে সামনে রেখে আজকের বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈঠকেই দলের পরবর্তী কর্মকৌশল ঠিক হবে।
বিএনপির সিনিয়র নেতা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, রাষ্ট্রপক্ষ কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। প্রসিকিউশনের কোনো এভিডেন্সেই মামলাটি প্রমাণিত হয়নি। সর্বোপরি মামলায় খালেদা জিয়ার ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয়নি। তারা আশা করছেন- আদালত সাক্ষ্য, কাগজপত্র, তথ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিলে এ মামলায় খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন। তবে বৃহস্পতিবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চেয়ারপারসনকে সাজা দেয়ার বিষয়টি সরকার ‘আগেই ঠিক করে রেখেছে’। এমন আশঙ্কা সরিয়ে রাখতে পারছে না বিএনপি নেতাকর্মীরা। তাদের আশঙ্কার জায়গা দুটি। এটা পরিষ্কার যে, সরকার আইনি জটিলতার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। দলের চেয়ারপারসনকে আগামী নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে এ মামলাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারে সরকার। সে ক্ষেত্রে শুধু আইনি লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করা সম্ভব হবে না। আবার রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার প্রেক্ষিতে নির্বাচনের সুযোগ পেলেও রায়কে হাতিয়ার করে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাবে সরকার। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, মামলার রায় নিয়ে দুই ধরনের প্রস্তুতি চলছে। রায়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হবে। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে আলোচনার বিকল্প পথ খোলা রাখা হবে। সেই সঙ্গে মামলার তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলেও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়া হবে। তাই খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যায় থেকে মামলার গতিবিধি সম্পর্কে কূটনৈতিক মহলকে আপডেট রাখা হচ্ছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২)(ঘ) উপ-অনুচ্ছেদে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে বলা আছে। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে’ তাহলে তিনি নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হবেন।’ তবে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন গৃহীত হলে উচ্চ আদালত সাজা পরিবর্তন ও রায় স্থগিত করতে পারেন। সে ক্ষেত্রেও নিম্ন আদালতে সাজা প্রাপ্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। যার উদাহরণ- আওয়ামী লীগ নেতা ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, বিএনপির লুৎফুজ্জামান বাবরসহ কয়েকজন দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় একজন আইনজীবীর জানান, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি এখনো সেটেল হয়নি। কোনো রায়ে নেই, আবার আইনও হয়নি। অনেক আগে একটি রায়ে বিচারপতি জয়নাল আবেদীন বলেছিলেন, নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। আর বিচারপতি খায়রুল হক বলেছেন পারবে না। এ বিষয়টির সুরাহা তৃতীয় কোনো বেঞ্চে যায়নি। এ বিষয়টি পুরো অস্পষ্ট। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, এখন পর্যন্ত আইন যা আছে, তাতে আপিল করলে জামিন পাবেন। জামিন পেলেই নির্বাচন করতে পারবেন। আপিলটা ট্রায়াল কোর্টের কন্টিনিউয়েশন। আপিল কোর্টে যা হবে, সেটাই ফাইনাল। যতক্ষণ না ফাইনাল হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত নয়; জেল হিসেবে কাউন্ট হবে জাজমেন্টের পর। আইনজীবীরা জানান, ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। ফলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা হিসেবে অর্থদণ্ডও হতে পারে। এই ধারায় আদালত কারাদণ্ড না দিয়ে শুধু জরিমানা দণ্ডও করতে পারেন। কেননা এই ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
বিএনপি নেতারা জানান, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার মাধ্যমে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে চায় সরকার। মামলা দুটির গতি-প্রকৃতি, আদালতের আচরণ ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে সেটাই ফুটে উঠেছে। তাই নির্বাচনী বিধি আরপিও’র কিছু ধারা-উপধারা নিয়ে পর্যালোচনা করছেন সিনিয়র আইনজীবী ও নেতারা। বিএনপি নেতারা জানান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজা হলেও তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আপিল গৃহীত হলে চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতেও কোন বাধা থাকবে না। এছাড়া রাজনীতিতে বৃহত্তর আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হলে অতীতের নজিরকে ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে পারেন খালেদা জিয়া। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতা ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে সাজার উদাহরণগুলো তৈরি করতে পারে সে সুযোগের অবকাশ। তাহলে খালেদা জিয়ার আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা থাকবে না। কারণ বিদ্যমান আরপিওতে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- জনগণই আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে দেবে।
দলটির নীতিনির্ধারক ফোরামের একাধিক সদস্য জানান, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় বিএনপি। তার জন্য দেশের মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের ইতিবাচক সমর্থন আদায়ে সরকারের অব্যাহত হয়রানি ও উসকানির মুখেও কয়েক বছর ধরে ধৈর্যের সঙ্গে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করছে তারা। পাশাপাশি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে ভোটযুদ্ধে লড়তে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তৈরি, দলের সম্ভাব্য প্রার্থী জরিপ, নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি, ২০ দলীয় জোটের বাইরে দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়া, তৃণমূল থেকে দল পুনর্গঠনসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে এবং নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা ইতিবাচক না এলে বিএনপি নতুন কৌশল নির্ধারণ করবে। তবে তারা এখনও আশাবাদী- বিএনপির জনসমর্থনের প্রতি ইতিবাচক নজর রাখবে আন্তর্জাতিক মহল এবং জনমত ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে সরকার। এ জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি আলোচনার একটি পথও খোলা রাখবে বিএনপি। রায় নিয়ে বিএনপির ভাবনা সম্পর্কে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, আদালত দিয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাইলে তার জবাব দেয়া হবে। কোনো ঘটনা কারো জন্য বসে থাকে না। সময়ই বলে দেয় কে নেতৃত্ব দেবে এবং কারা রাজপথে থাকবে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করবো কিনা এই ঘোষণা না দিলেও কোনো কিছু যে ঘটবে না- এমন নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না! ৮ই ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার দিনকে ফয়সালার দিন আখ্যায়িত করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, রাস্তায় কে নামলো কে নামলো না এটা নিয়ে কিছু বলার নেই। বাংলাদেশের মানুষ বসে থাকবে না। বৃহস্পতিবার দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র রিজভী আহমেদ বলেছেন, আদালতের মাধ্যমে সরকারের কোনো অশুভ ইচ্ছার প্রতিফলন হলে দেশে সাইক্লোন ঘটবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে রাজপথে থাকবে আওয়ামী লীগ: খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়কে ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। রায়কে ঘিরে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে সারা দেশে। এ ছাড়া আদালতের রায়কে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্দেশনা দেয়া হবে সরকারের তরফে। বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যেও এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দলটির নেতারা বলছেন, এর আগে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াত সারা দেশে যে নাশকতা করেছিল তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় নেতাকর্মীরা মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন। সামনেও এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণাকে ঘিরে কোনো বিশৃঙ্খলা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রায় ঘিরে জনগণের জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।
আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম মানবজমিনকে বলেন, খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপির মহাসচিব তার বক্তব্যের মাধ্যমে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। দলগতভাবে বিএনপি অনেকটা দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে। রায় কী হবে- তা গায়েবিভাবে কিংবা অলৌকিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জানার কথা নয়। যদি তারা জেনে থেকে কোনো মন্তব্য করে থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে- বিচারক এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে তাদেরই (বিএনপি নেতারা) হয়তো কোনো গোপন আঁতাত বা যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কিছু হলে নৈরাজ্য সৃষ্টির যে হুমকি বিএনপি নেতারা দিয়েছেন তা গণতান্ত্রিক রাজনীতি, আইনের শাসন ও স্বাভাবিক পরিস্থিতির পরিপন্থি। এ জাতীয় কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে নিশ্চয়ই জনগণ তা প্রতিহত করবে। তিনি বলেন, সরকার সাংবিধানিকভাবে নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত। আদালতের কোনো রায়কে ঘিরে নৈরাজ্য হলে সরকার তা কঠোরভাবে দমন করার পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের নৈরাজ্য, সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অবশ্যই রাজপথে থাকবে।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, খালেদা জিয়ার রায়টি একান্তই আদালতের বিষয়। মামলা বিচারাধীন আছে। রায়ে যদি তিনি দণ্ডিত হন, সেটা আইনগতভাবেই হবে। আর এই রায়কে কেন্দ্র করে জানমাল বা মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা যদি কেউ করে তাহলে জনগণ সমুচিত জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগও কোনো ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বরদাশত করবে না।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম বলেন, খালেদা জিয়ার মামলাটি কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়। এই মামলা দুর্নীতির মামলা। এই মামলা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হয়নি, মামলা হয়েছিল বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। খালেদা জিয়ার মামলার রায়টি আদালতের বিচার্য বিষয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলে রায়ে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। আর যদি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে আদালত তাকে সাজা দিবেন। তাই, এ নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই। তিনি বলেন, রায়কে কেন্দ্র করে যদি বিএনপি দেশে কোনো অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে নিশ্চয়ই তা সেভাবেই মোকাবিলা করা হবে। আওয়ামী লীগ যেহেতু রাজপথের দল, মাঠের দল তাই আওয়ামী লীগও রাজপথে থাকবে।
রায়কে ঘিরে বিএনপি নেতাদের হুঁশিয়ারির জবাবে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বিএনপি আবারো যদি আগুন জ্বালানের চেষ্টা করেন, তাহলে সেই আগুনে তারাই জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে হাছান মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়ার বিচারের রায় হবে। রায়ের আগে বা পরে দেশে বিশৃঙ্খলা চালানোর অপচেষ্টা করা হবে। সরকারি দলের নেতাকর্মী হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পেট্রোল বোমা বাহিনীকে প্রতিহত করতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

আরও পড়ুনঃ   বিএনপি-জামায়াতকে চাপে রাখতে আ.লীগের কৌশল

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × 5 =