খুলনা হার্ডবোর্ড মিলের কারখানা ও গুদামে পড়ে আছে প্রায় আড়াই কোটি টাকার হার্ডবোর্ড। দাম বেশি হওয়ায় এসব পণ্য ডিলারদের কাছে বিক্রি করা যায়নি। তাই অনেক হার্ডবোর্ড ইতিমধ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এদিকে প্রায় চার বছরের বেশি সময় ধরে মিলটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তাতে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণে থাকা মিলটির উৎপাদন পুনরায় চালু করা কিংবা গুদামে পড়ে থাকা হার্ডবোর্ড বিক্রির কোনো উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বিসিআইসির কাগজপত্রে মিলটি চালু আছে। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে করপোরেশনের আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিলটি ৬০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। মূলধনের অভাবে এবং কাঁচামালের সংকটের কারণে মিলটির উৎপাদন ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে বন্ধ আছে।

দেশের একমাত্র সরকারি হার্ডবোর্ড মিলটি ১৯৬৫ সালে স্থাপন করা হয়। কানাডীয় অনুদানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা মিলটি স্থাপন করে। স্বাধীনতার পরে সেটি বিসিআইসির কাছে আসে। তখন কারখানার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩ কোটি বর্গফুট।

খুলনার খালিশপুর এলাকার এই মিলে গত বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলসের পাশের ১০ একর জমির ওপর হার্ডবোর্ড মিলের পুরো চত্বর খাঁ খাঁ করছে। মূল কারখানা ভবন ও গুদাম, এমনকি প্রশাসনিক ভবনটিও তালা মারা। কাঠ গুঁড়া করার মেশিন এখন অলস পড়ে আছে।

নিরাপত্তাকর্মী লুৎফর রহমান বললেন, সব মিলিয়ে সাতজন নিরাপত্তাকর্মী মিলটি পালাক্রমে পাহারা দেন। তা ছাড়া দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তবে তাঁরা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলেই দাপ্তরিক কাজ করেন।

২০০২ সালে বিএনপি সরকার মিলটি লে অফ ঘোষণা করে। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেটি আবার চালু করা হয়। তখন কাজ নেই, মজুরি নেই ভিত্তিতে মিল চলছিল। তবে জোড়াতালি দিয়ে চলা মিলটির লোকসান বেড়েই যাচ্ছিল। অর্থের সংকটে পড়ে ২০১১ সালের জুলাইয়ে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুনঃ   কেজিপ্রতি ১০৮ টাকা দামে গরুর মাংস আমদানি

বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর ঘোষণা দেয়। পরে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী খুলনা সফরে এসে হার্ডবোর্ড মিলটি চালুর ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে ১০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়ে মিলটি চালুর উদ্যোগ নেয় বিসিআইসি। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে মিলটি চালু করা হয়। তবে তিন মাসের মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। তখন শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা মিলে কর্মরত ছিলেন প্রায় ২০০ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হার্ডবোর্ডের কাঁচামাল কাঠ ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১১ সালে মিলটি বন্ধ হওয়ার আগে প্রতি পিস (৩২ বর্গফুট) হার্ডবোর্ড ডিলারদের কাছে বিক্রি করা হতো ২৬২ টাকায়। ২০১৩ সালে সরকারি নির্দেশে চালু হওয়ার পর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি পিস হার্ডবোর্ডের বিক্রয়মূল্য ঠিক করা হয়েছে ৫৪০ টাকা।

নিরাপত্তাকর্মী লুৎফর রহমান বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিলাররা আমাদের হার্ডবোর্ড নিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ বাজারে তখন আরও কম দামে বোর্ড পাওয়া যায়। তাতে গুদামে জমতে থাকল পণ্য। এদিকে চলতি মূলধনে সংকট দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত বন্ধই হয়ে গেল। তিনি বলেন, সুন্দরী ও গড়ান কাঠ এবং পরে স্থানীয় কাঠ দিয়ে হার্ডবোর্ড তৈরি হতো। আমাদের মিলের বোর্ডের মান খুবই ভালো ছিল।

লুৎফর রহমানের আক্ষেপ, গুদামে পড়ে থাকতে থাকতে হার্ডবোর্ড নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দাম কমিয়ে হলেও বিক্রি করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বিসিআইসির। না হলে ভবিষ্যতে এগুলো আর বিক্রিই হবে না।

মিলের পাশেই ভৈরব নদ। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল মিলের সাবেক শ্রমিক সাইদুল ইসলামকে। বললেন, মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ঘাটে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। আশায় আছেন, আবার মিল চালু হবে এবং কাজ করবেন সেখানে।

অবশ্য সাইদুলের আশা পূরণের কোনো লক্ষণ নেই। ২০১৪ সালে বন্ধ শিল্পে প্রাণ ফেরাতে বিলুপ্ত প্রাইভেটাইজেশন কমিশন খুলনা হার্ডবোর্ড মিলসহ
চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠায়। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। মিল চালুর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ আপাতত নেই বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান মো. নুরুল্লাহ বাহার।

আরও পড়ুনঃ   ছয় মাসে প্রবাসী আয় সাড়ে ১২% বেড়েছে

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

13 + 17 =