খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষরের মাধ্যমে গণসংযোগ করছে বিএনপি। প্রথম দু’দিনের প্রাথমিক হিসাবে সারা দেশে সংগৃহীত স্বাক্ষরের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে স্বাক্ষরের এ সংখ্যা। বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহের মাধ্যমে এ দাবিতে দেশে-বিদেশে সমর্থন আদায় ও সরকারের ওপর  চাপ তৈরি করতে চায় বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান চালিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিজে স্বাক্ষর করে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচিটি উদ্বোধনের সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে একটি মিথ্যা সাজানো মামলার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে।

তার মুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, চেয়ারপারসনকে কারাগারে পাঠানোর পর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর তৃণমূলের চাপ ছিল কড়া কর্মসূচি ঘোষণার। বিএনপির আন্দোলন সক্ষমতা নিয়ে সরকারের তরফেও আসছিল নানা মন্তব্য। তবে সব ধরনের চাপ ও উস্কানি এড়িয়ে ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বিএনপি। তারই অংশ হিসেবে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জনমত সৃষ্টি, কর্মী-সমর্থক পর্র্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার ও দলীয় ঐক্য সুদৃঢ় রাখতেই নেতারা সিদ্ধান্ত নেন গণস্বাক্ষর সংগ্রহের। বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র জানায়, কর্মসূচির প্রথমদিন নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়েই সংগৃহীত হয়েছে ১২ হাজারের বেশি স্বাক্ষর। দ্বিতীয়দিনও কর্মী-সমর্থকরা লাইন দিয়ে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর বিএনপি কার্যালয়ের চিত্রও একই রকম। দপ্তর সূত্র জানায়, প্রথম দু’দিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাথমিকভাবে যে হিসাব এসেছে তাতে প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে সংগৃহীত স্বাক্ষরের সংখ্যা বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতাকর্মীরা শেয়ার করছেন গণস্বাক্ষর সংগ্রহের নানা ছবি। এসব ছবিতে দেখা যায়, গ্রামের ক্ষেত্রে লুঙ্গিপরিহিত এক তৃণমূল কর্মীর হাতে গণস্বাক্ষরের ফর্মে স্বাক্ষর করছেন সফেদ শ্মশ্রুধারী এক বৃদ্ধ কৃষক। স্কুলের সামনে ও মাদরাসায় উৎসাহের সঙ্গে স্বাক্ষর দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। গ্রামে বাড়ির আঙ্গিনায় লাইন ধরে স্বাক্ষর দিচ্ছেন একদল নারী। একইভাবে মাটি কাটার শ্রমিক, ক্ষেতে কর্মরত কৃষাণ-কৃষাণী, গঞ্জের চায়ের দোকানে আড্ডারত মানুষ, দোকানদার, নগরীর ফুটপাথ, মার্কেটসহ নানা জায়গায় গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে স্বাক্ষর দিচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। নেতারা জানান, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো এবং কারাগারে তাকে ডিভিশন না দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানির ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার আগে দলের সিনিয়র নেতা ও জোটের নেতাদের বৈঠকে বিশেষ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, দাবি আদায়ে আন্দোলনের বিকল্প নেই। কিন্তু কোনোভাবেই সরকারের ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। কড়া কর্মসূচি দিলে অতীতের মতো সরকার নিজেদের লোক দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাবে। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন নতুন মামলা দায়ের ও ধরপাকড়ের মাধ্যমে পরিবেশ আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে। তাই আন্দোলন করতে হবে শান্তিপূর্ণ। যে আন্দোলনে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হবে না বরং জনসম্পৃক্ততা বাড়বে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনাও তেমনই। আন্দোলন কর্মসূচি প্রণয়নে তাই কৌশলে পা ফেলছেন বিএনপি নেতারা। গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে দলের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত রয়েছেন। ফলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নৈরাজ্যের অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে জনদৃষ্টি ফেরানোর কৌশল নিতে পারছে না সরকার। তারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়ে উল্টো বেকায়দায় পড়েছে সরকার। মুক্ত খালেদা জিয়ার চেয়ে বন্দি খালেদা জিয়া বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। দিনদিন তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অন্যদিকে বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় রাজপথে নামা ও প্রকাশ্য তৎপরতার কিছুটা হলেও সুযোগ পাচ্ছে। এতে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত ও বিএনপির জনসমর্থন বাড়ছে। যার দুটোই সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আগামীতে এটা আরো জোরালো হবে।
দলের কট্টরপন্থি সিনিয়র নেতা ও তরুণ নেতাদের একাংশ এখনই হার্ডলাইনে যাওয়ার পক্ষে। তারা মনে করেন, দলের শীর্ষ নেতাকে কারাগারে পাঠানোর পর দলের উচিত ছিল সর্বোচ্চ শক্তি প্রদর্শন। নরম কর্মসূচি দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও  নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় সম্ভব নয়। কর্মসূচি নিয়ে তাই দলের সিনিয়র নেতাদের নমনীয় নীতিকে বাঁকা চোখে দেখছেন তরুণ নেতাদের একাংশ। কর্মসূচি ইস্যুতে দলের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও আপাতত শান্তির পথ ছাড়বে না বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতারা মনে করেন, কঠোর কর্মসূচি দিলেই তৈরি হবে সংঘাত ও সহিংসতা ঘটার আশঙ্কা। এতে একদিকে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা নতুন করে মামলা-হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অন্যদিকে সরকার পরিকল্পিত নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের সুযোগ পাবে। নেতাদের দৃঢ় বিশ্বাস শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে রচিত হবে বৃহত্তর আন্দোলনের ভিত। চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই বিএনপি ও খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়াবে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোটের মাঠে। নেতারা জানান,  শুধু গণস্বাক্ষরই নয়, আগামীদিনের কর্মসূচিগুলোও জনগণের দুর্ভোগ এড়িয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রণয়ন ও পালন করা হবে। মানুষ সংঘাত ও সহিংসতাপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তন চায়। বিএনপিকে সেই পরিবর্তনের রাজনীতিই দিতে হবে। বিএনপি সে লক্ষ্যে এগুতে থাকলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে নিজ নিজ ব্যানারে সরব হবে পেশাজীবীরা। জাতীয় ইস্যুতে কর্মসূচিগত ঐক্যের হাত বাড়িয়ে দেবে দুই জোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো।
গণস্বাক্ষর কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সাজানো মামলায় দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক রায়ের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে সরকার। দেশের মানুষ এ রায়কে মেনে নিতে পারেনি। গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়ে সেটাই জানিয়ে দিচ্ছে নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার বিএনপি নেতাকর্মীদের নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। কিন্তু তাদের সে ষড়যন্ত্র এবার সফল হবে না। একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দল হিসেবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যাবে বিএনপি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু সরকারের ওপর জনমতের চাপই সৃষ্টি হবে না, দলের সকল পর্যায়ে ঐক্যের ভিতও সুদৃঢ় হবে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। আমাদের এ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বানচাল করতে নানাভাবে উস্কানি দিচ্ছে সরকার। কিন্তু এবার কোনো উস্কানির ফাঁদে পা দেবে না বিএনপি। গণস্বাক্ষর সংগ্রহের মতো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে থাকলে ব্যাপক গণসংযোগের সুযোগ তৈরি হয়। আমরা গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে দেশনেত্রীর মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করবো। তিনি বলেন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচিটি নিয়ে আমাদের নেতাকর্মীরা হাটে-মাঠে, পাড়া-মহল্লায় কাজ করছেন। সবখানে ব্যাপক সাড়া মিলছে, যা নেতাকর্মীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করছে। এক সপ্তাহ পর আমরা সংগৃহীত স্বাক্ষরের একটি হিসাব নেব। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতি সরকারের যে উস্কানি তার বিরুদ্ধে একটি দূরদর্শী কর্মসূচি হচ্ছে এ গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। মানুষ এ কর্মসূচিটিকে এতোটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে যে, সংকোচহীনভাবেই সাড়া দিয়ে স্বাক্ষর করছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শেখ রবিউল আলম রবি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কর্মী-সমর্থকরা ঢাকা মহানগরের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, গলি-মহল্লায় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন। প্রথম দুইদিনে যে সাড়া মিলেছে তা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক সাধারণ সমর্থকও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর ফরমে স্বাক্ষর করেছেন।

আরও পড়ুনঃ   নড়াইলে ইউপি চেয়ারম্যান হত্যায় আ’লীগ নেতা গ্রেফতার

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

fifteen − 2 =