মিয়ানমার থেকে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা তাদের ওপর চালানো নৃশংসতার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। বন্দিদশা থেকে পালিয়ে আসা আবদুল আজিজ নামে এক রোহিঙ্গা যুবক বিবিসি বাংলাকে তাদের ওপর অত্যাচারের রোমহর্ষক বয়ান দিয়েছেন। তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের গুলি করার পর হত্যা নিশ্চিতে জবাই করতে দেখেছেন। এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইয়াং বলেছেন, রোহিঙ্গারা কখনও মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠী ছিল না; এটি ‘বাঙালি ইস্যু’। তাদের বিরুদ্ধে এক হওয়ার আহবান জানিয়েছেন তিনি।

আজিজের ভাষায়,‘সেদিন ছিল বুধবার। বিকালে আসরের নামাজ পড়তে বের হয়েছি। সেসময় আমাকে ধরে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী। আমার বাড়ি রাখাইনের গারোতো বিলে। বাড়ি থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিছু্?ই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চোখ খুললে বুঝতে পারলাম আমাকে একটা গোয়াল ঘরে রাখা হয়েছে। দেখলাম ঘরভর্তি মানুষ। আমার মতই তাদেরকেও ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে আমাদেরকে নিয়ে গরুর রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে ।’

‘যখন বেঁধে রেখেছিল তখন দুইজন পাহারা দিয়েছে, কারোর বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রচণ্ড মারধর করে আমাকে। তারা মিয়ানমারে ভাষায় বলছিল ‘লো কালা’ অর্থাত্ তোরা আমাদের দেশি না, তোরা বাঙালি, তোরা ওখানেই চলে যা। আমার সামনে কয়েকজনকে জবাই করছে আবার কাউকে কাউকে গুলি করে মেরেছে। গুলি মারার পর তখনো যদি সে নড়তে থাকে তাহলে তাকে জবাই করে দেয়। পাহারাদাররা যখন দরজা থেকে সরে গেছে তখন তাদের অবস্থান দেখে আমি পালিয়ে আসি। ’

‘আমি যখন ওইখান থেকে বের হয়ে আসি তখন যাদেরকে তখনো হত্যা করেনি তাদের                 সবার হাত পা বাঁধা ছিল। এর পর কি করেছে আমি জানি না। আমি যখন এসেছি তখনো ওইখানে অনেক মানুষ ছিল, শুধু ছিল পুরুষ মুসলিম, কোন মহিলা ছিল না । আমার বাড়ি বোমা মেরে জ্বালিয়ে দিয়েছে নাকি ম্যাচের আগুনে জ্বালিয়ে দেয় সেটা আমি জানি না, কিন্তু আমার প্রতিবেশীরা বলেছে বোমা মেরে জ্বালিয়ে দিয়েছে।  ওখানে ওখানে মুসলিমের কোন দাম নাই, খাবার পানি দেয় না।’

আবদুল আজিজ আরো বলেন, ওইখানে আমার মতো যুবক যারা ছিল তাদেরকে আগেই ধরে নিয়ে গেছে, তাদেরকে মেরে ফেলেছে, কেটে ফেলেছে । ওখানে যুদ্ধ করছে এমন কোন রোহিঙ্গা আমরা পাইনি । ওখানে যুদ্ধ করার মতো লোক আছে বলে আমার মনে হয় না।

নাসিমা খাতুন নামে এক বৃদ্ধা আল জাজিরাকে বলেন, আমরা ওখানে বেশ ভালোভাবেই ছিলাম। সেনাবাহিনী বন্দুক দিয়ে আমাদের গ্রামের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া শুরু করলে আমরা বিভিন্ন দিকে দৌড়াতে শুরু করি। আমি একটি জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানেই আমি জানতে পারি আমার স্বামীকে ওরা গুলি করে হত্যা করেছে। এরপর আমার কন্যাসহ প্রতিবেশিরা এক কাপড়ে বাংলাদেশে চলে আসি।

জহির আহমেদ নামে এক ব্যক্তি ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে জানান, বার্মিজ বাহিনী তার গ্রামের বাসিন্দাদের একটি নদীর পাশে দাড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি করতে থাকে। মৃতদেহগুলি নদীতে গিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, আমি সংকীর্ণ নদীর ওপাড় থেকে দেখলাম যুবক ও কিশোরদের গুলি করা হচ্ছিল। আর শিশু ও নবজাতকদের পানিতে ছুড়ে হত্যা করা হয়।

‘রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এক হন’

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠী বলে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে এক হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং। তার দাবি, রোহিঙ্গারা কখনও মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠী ছিল না; এটি ‘বাঙালি ইস্যু’। গত শনিবার  নিজের সরকারি ফেসবুক পেজে এমন দাবি করেছেন বলে গতকাল রবিবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেছেন, ‘তারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে অথচ তারা কখনও মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠী ছিল না। এটি ‘বাঙালি’ ইস্যু। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’ এর আগে গত শনিবার ডিফেন্স সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্কুলের এক ডিপ্লোমা বিতরণ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেন, বিদেশি সংস্থাগুলো যা বলছে তাতে কান দেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের উচিত্ হবে না। বরং তাদের গোপন আঁঁতাতের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

13 − 12 =