দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুর্নীতির এন্তার অভিযোগ জমা পড়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে হাসপাতালের নার্স, আয়া, দারোয়ানসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে ইন্টার্ন চিকিৎসক থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও। পাওয়া গেছে শক্তিশালী দালাল চক্রের বিরুদ্ধেও অভিযোগ। তবে এন্তার অভিযোগের মধ্য থেকে ৯৪টি অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন বলে জানিয়েছেন দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক আকতার হোসেন। তিনি জানান, গত রোববার নগর বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় আয়োজিত দুদকের গণশুনানিতে এন্তার অভিযোগ জমা পড়ে।

চমেক হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা গণশুনানিতে উপস্থিত থেকে এসব অভিযোগ শুনেছেন।
শুনানিতে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম নবী অভিযোগ করেন, পিঠের টিউমার গলে যাওয়ায় দুপুর ১টার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান ভর্তি হওয়ার জন্য। কিন্তু অফিস টাইম পার হয়ে গেছে বলে তাকে ভর্তি নিতে গড়িমসি করা হয়। পরে একজন চিকিৎসকের সহযোগিতায় তিনি ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার পর তার ওয়ার্ডে খালি বেড থাকলেও তাকে দেয়া হয়নি।
বাঁশখালীর হতদরিদ্র এক রোগীর অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এলাকা থেকে চাঁদা তুলে তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসা করাচ্ছেন। কিন্তু ওষুধ কিনতে গেলে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের পছন্দের দোকান থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য করে। না কিনলে দুর্ব্যবহার করে।
একজন প্রকৌশলী তার প্রতিবন্ধী ভাইয়ের চিকিৎসা নিতে এসে আরো বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন। তিনি বলেন, একজন জুনিয়র চিকিৎসক তার সঙ্গে প্রচুর দুর্ব্যবহার করেছেন। প্রতিবাদ করায় ওই চিকিৎসক তার রোগীকে ডিসচার্জ করে দেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হয়ে তিনি তার রোগীর ডিসচার্জ অর্ডার প্রত্যাহার করান। কিন্তু এরপরও তার অভিজ্ঞতা তেমন ভালো ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি তার রোগীকে ঢাকার পিজি হাসপাতালে নিয়ে যান। আরেকজন রোগীর অভিভাবকের অভিযোগ, কোনো ডায়াগনস্টিক হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা করাতে হবে তা ওয়ার্ডের লোকজন ঠিক করে দেন। তাছাড়া রোগীর পরীক্ষার ব্যবস্থাপত্র নিতে হয় দালালদের কাছ থেকে। রোগীর অভিভাবককে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দেয়া হয় প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর জন্য।
এমন বহু অভিযোগের কথা তুলে ধরে দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, এরমধ্য থেকে গার্ড আয়াদের বিরুদ্ধে ১৩টি অভিযোগ, বাইরে থেকে ওষুধ কেনার কমিশন বাণিজ্য নিয়ে ছয়টি, প্যাথলজিক্যাল হয়রানি নিয়ে পাঁচটি, লিফটম্যানের বিরুদ্ধে তিনটিসহ ৯৪টি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদক কমিশনার ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দুর্নীতি ও সমস্যার মূল উৎস খোঁজার চেষ্টা করছি আমরা। তবে হাসপাতালে পেনিক সৃষ্টি করবো না আমরা। অর্থ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ জন্য আমরা তিন মাস সময় দিয়েছি। মার্চের শেষের দিকে চমেক হাসপাতালে আবারো গণশুনানির পর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, হাসপাতালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। এ সমস্যাসহ নানা সমস্যা নিরসনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে সপ্তাহে অন্তত একবার গণশুনানি করতে পারেন। একইসঙ্গে অভিযোগ কেন্দ্র খোলার পরামর্শ দেয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক নার্সদের পরিচয়পত্র এবং এপ্রোন পরা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়। যাতে রোগী এবং রোগীর অভিভাবকরা চিনতে পারেন কে চিকিৎসক আর কে বহিরাগত। দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরামর্শ দেয়া হয়।
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, সেবাদানের ক্ষেত্রে হাসপাতালের চিকিৎসকরা ৯০ ভাগ সফল। তবে সময় এসেছে যিনি শিক্ষক তিনি শুধু শিক্ষকতা করবেন, যিনি চিকিৎসক তিনি চিকিৎসা দেবেন।
তিনি বলেন, হাসপাতালের একটি ফ্যান নষ্ট হয়ে গেলে পরিচালকের ক্ষমতাবলে তিনি তা মেরামত করতে পারেন না। পিপিআর অনুসরণ করতে হয়। সিটিস্ক্যান মেশিনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অচল। এমআরআই মেশিন আছে, ফিল্ম কিনতে দেরি হচ্ছে বলে মেশিনটি চালু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ৫০০ বেডের হাসপাতালের জনবল দিয়ে সাড়ে তিন হাজার রোগীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। ৬০ বছর আগের জনবল দিয়ে পরিচালিত এই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও জনবল প্রতিনিয়ত কমছে। চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল, একটি হৃদরোগ হাসপাতাল এবং একটি ট্রমা সেন্টার করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি। তাছাড়া শিশু হাসপাতালের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে কিন্তু এখনো পাওয়া যায়নি। অথচ চমেক হাসপাতালের এক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে। এসব দেখার জন্য একজন এস্টেট অফিসারও নেই।

আরও পড়ুনঃ   রেডিসন ব্লু হোটেলের মেজবান হলে চার দিনব্যাপী আবাসন মেলা

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × two =