বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যৌনসহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেফতার এবং একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে। মাতৃভূমি ছেড়ে আসা এ নির্যাতিত জনগোষ্ঠী এখন দিন কাটায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। নিজেদের কোনো কর্ম নেই, তাই জীবনযাপনের জন্য মানুষের দেয়া সাহায্যের ওপরই ভরসা করতে হয় তাদের। এ অবস্থার মধ্যে গত রোববার রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একটি প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ। প্রস্তাবে রাখাইনে রোহিঙ্গানিধন বন্ধ এবং সেখানে ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকার দেয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এটিকে ‘জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) উত্থাপিত প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট পড়েছে ১২২টি, বিপক্ষে ১০টি। এ ছাড়া ২৪টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৬ নভেম্বর সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক থার্ড কমিটিতে একই আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়। যদিও সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাব মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই, তবে এটি রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে আশা করা যায়।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে সাধারণ পরিষদে দেড় মাসের কম সময়ের মধ্যে দুইবার প্রস্তাব পাস হলেও জাতিসঙ্ঘের সর্বময় ক্ষমতাধর সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি। এর কারণ চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতা। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা ইতোমধ্যে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে সহায়ক হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন মিয়ানমারে গণহত্যার কড়া সমালোচনা করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ বলে মন্তব্য করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে কথা বলেছেন। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের প্রতিবাদে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে চীন, রাশিয়া ও ভারত মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সত্য, তবে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রভাবশালী এই তিন দেশকে পক্ষে আনার প্রয়াস অব্যাহত রাখা উচিত বাংলাদেশের। কারণ রোহিঙ্গা সমস্যাটি বাংলাদেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুনঃ   ‘স্ত্রীর উচ্চাভিলাষে’ ৩৭ বছরের একনায়কের পতন

এ দিকে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত জাতিগত নিধন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক জেনারেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মং মং সোয়ে নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই জেনারেলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরো কয়েকজন ব্যক্তির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবারই এ সংক্রান্ত একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
এ নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রক্ষিত সম্পদ জব্দ করা হবে। পাশাপাশি তাদের সাথে কোনো মার্কিন নাগরিকের কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনে যুক্ত হওয়ার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ কক্সবাজারের শিবিরগুলোয় পাঁচ বছরের কম বয়সী এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২৫ শতাংশ শিশুই চরম অপুষ্টিতে ভুগছে।

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রদেশ রাখাইনে মিয়ানমার পুলিশ ও সেনাচৌকিতে আগস্টে সংঘটিত সন্দেহভাজন রোহিঙ্গা জঙ্গিদের হামলার জবাবে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। অভিযান শুরুর পর থেকেই মিয়ানমার সেনাদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মুখেও শোনা যায় এসব বর্বরতার মর্মস্পর্শী বিবরণ। অন্য দিকে, শুরু থেকেই বেসামরিক রোহিঙ্গা নাগরিকদের সাথে কোনো ধরনের বর্বর বা নিপীড়নমূলক আচরণে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাতমাদোর (বর্মি সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম) দাবি, মূলত রোহিঙ্গা জঙ্গিদের লক্ষ্য করেই এ অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। বেসামরিক ব্যক্তিদের ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো লক্ষ্য নিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে না। যদিও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে রাখাইনে একের পর এক রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়াসহ গণহত্যা সংঘটনের আলামত পাওয়া গেছে।

গত আগস্টে মিয়ানমারের একটি সীমান্তচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন, ধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত সোয়া ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ ছাড়া ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে জাতিগত দাঙ্গার ঘটনায় দুই দফায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। তখন আলোচনার মাধ্যমে কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হলেও তাদের বেশির ভাগ বাংলাদেশে রয়ে গেছে। অশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় আর্থ-সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এ অবস্থায় জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হলে তা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের জন্যই হবে স্বস্তিদায়ক।

আরও পড়ুনঃ   মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ওবামা সর্বাধিক প্রশংসিত পুরুষ

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

thirteen − 4 =