হাবিব রহমান, আব্দুল্লাহ মনির ও পলাশ বড়ুয়া, উখিয়া থেকে: ৭ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশু রবিউল। প্রখর রোদে ছাউনির ভেতর বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। ভাতের সঙ্গে শুধু শুকনো মরিচ ভর্তা। ঝালে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, তবু ক্ষুধার্ত শিশুটি খুব আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। দৃশ্যটি গতকাল দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের। এই দৃশ্য এখন প্রায় সব রোহিঙ্গা পরিবারেই। কারণ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছে না কেউ। চাল-ডাল পেলেও অন্যান্য পণ্য কিনতে হয় তাদের।এ অবস্থা শুধু রোহিঙ্গা শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। টেকনাফ ও উখিয়ায় পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যানবাহনে ভাড়া বৃদ্ধি, স্কুল-কলেজে পড়ালেখায় বিঘœ, পরিবেশ দূষণসহ নানা কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নেমেছে ভিক্ষাবৃত্তিতে।

তবে এর পরও হাসিমুখে সব মেনে নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যে মানবিকতা দেখিয়েছে, তাতেই যেন সমর্থন সবার। আর সেনাবাহিনী কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে সার্বিক পরিস্থিতি।রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার। বেশিরভাগ বিক্রেতা রোহিঙ্গা, ক্রেতাদেরও সবাই রোহিঙ্গা। গতকাল এমন দুটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ দামে জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। রোহিঙ্গা শিবিরের বাইরে কুতুপালং, উখিয়া ও কোটবাজার এলাকায় পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সব পণ্য চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।রোহিঙ্গা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিকেজি শসা ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৭০, কাঁচামরিচ ১৬০, আলু ৪০, করলা ৬০, বরবটি ৪৫, ঝিঙা ৪৫, মুলা ৬০, বেগুন ৬০, পেঁয়াজ ৪০, রসুন ১০০, প্রতি আঁটি কলমিশাক ১৫, পাটশাক ১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, স্রোতের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী আসার পর থেকে বাড়তে শুরু করে পণ্যের দাম।এদিকে কক্সবাজার থেকে উখিয়া হয়ে টেকনাফ রোডের ভাড়া এখন প্রায় দ্বিগুণ। কুতুপালং বাজার থেকে উখিয়া সদর পর্যন্ত আগে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেওয়া হতো। এখন ২০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা, সেটি এখন ৯০০ থেকে ১ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে।এদিকে রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগেরই আশ্রয় মিলেছে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়। এ দুটি উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের চেয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা অনেক বেশি। নির্দিষ্ট শিবির ঠিক করে দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গাদের; কিন্তু তাদের বিশাল স্রোত রাস্তাঘাট, বাজার সব জায়গা ছড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে ছুটে আসছে দেশি-বিদেশিরা। মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, সংস্থা। সড়কে ত্রাণের গাড়ির বহর। অনেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে আসছে দূরদূরান্ত থেকে। তাদের ইতোমধ্যে উখিয়ায় আটকে দিচ্ছেন সেনাসদস্যরা। সড়কে ভিক্ষুকেরও অভাব নেই।রাজাপালং ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে কুতুপালং শরণার্থী শিবির। এই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, এত রোহিঙ্গা একসঙ্গে প্রবেশ করায় পণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ নানা সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে সেনা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় রাজনীতিকসহ সবার সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করছে।সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য স্থানীয় বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। বন্ধ ঘোষণা না করা হলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম। উখিয়া কলেজে সেনাবাহিনী ও বিজিবির কিছু কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী একটি পরিত্যক্ত ভবনে কাজ করছে আর বিজিবি কয়েকটি ক্লাসরুম ব্যবহার করে ত্রাণসহ রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যান্য মানবিক সহায়তা দিচ্ছে। এরই মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত সোমবার।উখিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ফজলুল করিম বলেন, রোহিঙ্গা আগমনের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে গেছে। এ ছাড়া বিজিবির অস্থায়ী ক্যাম্প এবং সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তাকেন্দ্র করায় শিক্ষা কার্যক্রমের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাহত হয়েছে। তবে কক্সবাজার জেলার স্কাউট এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করছেন রোহিঙ্গাদের জন্য।অন্যদিকে পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের থাকার জায়গা। রান্নাসহ নানা কাজে বন উজাড় করছে রোহিঙ্গারাও। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে স্থানীয় বন কর্তৃপক্ষ। তবে স্থানীয় প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, খুব দ্রুত পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সরবরাহ করা হবে রোহিঙ্গাদের।উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল খায়ের আমাদের সময়কে বলেন, একটি থানা এলাকায় যখন লাখ লাখ অতিরিক্ত মানুষ ঢুকে পড়ে, তখন সেখানকার স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। পরিস্থিতি নাজুক হওয়াই স্বাভাবিক।ইতোমধ্যে টেকনাফ ও উখিয়ার বৌদ্ধমন্দিরগুলো কড়া নিরাপত্তার আওতায় এনেছে পুলিশ। কক্সবাজার জেলার ১৩৫টি বৌদ্ধমন্দিরে সুরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে পুলিশ। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালিয়েছে বৌদ্ধরা। তারই রেশ ধরে যাতে এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘিœত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের দায়িত্বে রয়েছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আজিজুল ইসলাম আমাদের সময়কে জানান, গতকাল পর্যন্ত ২০ হাজার ৯৮৫ জনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × one =