জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকায় বিশ্ববাসী বিস্ট্মিত হয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তারা দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমার সরকার আরও আশকারা পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ‘উত্তর কোরিয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে পারে’- এই ধারণার ওপর জাতিসংঘের বড় দেশগুলো অবরোধ দিচ্ছে, হুমকি-ধমকিসহ বিভিম্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। পুরো একটি জাতিগোষ্ঠীকে তাদের বসতভিটা থেকে নির্মূলের কাজ প্রায় সম্পম্ন করে ফেলছে। সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটেছে। অথচ এ ব্যাপারে জাতিসংঘ
নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ খুবই অপ্রতুল।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। মিয়ানমার সরকারকে এই সুপারিশ বাস্তবায়নে কীভাবে বাধ্য করা যায়, সে ব্যাপারে কিছুই বলেননি। এমনকি দেশটির ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে কেউ প্রস্তাবও করেনি। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে সব ধরনের অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত রাখার জন্য সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এই পদক্ষেপ মোটেই যথেষ্ট নয়।
একমাত্র ফ্রান্স ছাড়া আর কারও বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে বিশ্বের যেখানেই গণহত্যা হয়েছে, জাতিসংঘ তা বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে রোহিঙ্গা ইস্যু ছিল তাদের জন্য ‘এসিড টেস্ট।’ দোষী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা কী পদক্ষেপ নেয় তা দেখার জন্য সারাবিশ্ব তাকিয়ে ছিল। তবে নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ মোটেই যথার্থ নয়।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলেছে। তবে এই সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকার কিছু করবে বলে কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। তারা তো সহিংসতাই বন্ধ করেনি। এটা ভাবা পুরোপুরি বোকামি যে, সে দেশের সামরিক বাহিনী এই সুপারিশকে স্বাগত জানিয়ে তা বাস্তবায়ন করবে। অং সান সু চিরও ক্ষমতা নেই সেনাবাহিনীকে নাখোশ করে এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করবেন।
আন্তর্জাতিক মহল এখন একটা দলিল হাতে পেয়েছে। গণহত্যা বন্ধে নিজেদের আরও সক্রিয় করার যে দায়- তা থেকে নিস্কৃতি পেতেই আনান কমিশনের প্রতিবেদনের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন এই কেতাবকে তারা ব্যবহার করছে।
নিরাপত্তা পরিষদের এই ভূমিকায় মিয়ানমার আরও আশকারা পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ একবিংশ শতাব্দীতে এসে যখন আন্তর্জাতিক এত মানবাধিকার দলিল রয়েছে, তখন এই অপরাধ ঘটছে। জার্মানির হিটলারের সময় এসব দলিল ছিল না। এসব দলিলের প্রয়োজন হলো হিটলারের কর্মকান্ডের কারণে। এর এত বছর পরে এসে এত দলিল থাকার পরও একটা রাষ্ট্র যদি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে যায় এবং পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে তাদের যদি সুযোগ তৈরি করে দেয়, তাহলে আর জাতিসংঘের প্রয়োজন থাকে কি?
চীন ও রাশিয়া তাদের কৌশলগত স্বার্থ, বাণিজ্যক স্বার্থ ও সামরিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েছে। বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করেনি। গণহত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনকে তারা ভ্রূক্ষেপ না করে সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবেই এই কাজগুলো করছে। জাতিসংঘ কেন সৃষ্টি হয়েছে? বিশ্বে যেন নিরাপত্তা থাকে, বিশ্বে যেন শান্তি থাকে। তবে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে ম্যান্ডেট তারা নিয়েছে, তা পালনে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। রাষ্ট্রের স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের বিষয় তারা যদি বিবেচনা করে তাহলে তো আর কিছু বলার থাকে না। চীন ও রাশিয়া তাদের বাণিজ্য ও কৌশলগত, সামরিক স্বার্থ রক্ষায় এ কাজগুলো করছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র বলে পরিচিত হলেও তারা কেন আশাহত করল তা আমরা জানি না। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে বলতে হবে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে। কারণ কিছুটা হলেও মিয়ানমারের ওপর তাদের চাপ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে। ভারতকে বলা উচিত, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থ, বাণিজ্যিক স্বার্থ, কৌশলগত স্বার্থ- এ যাবৎকাল আমরা রক্ষা করে এসেছি। যখন বিপদে পড়ি তখন তাদের দিক থেকে কিছুটা দায়িত্বশীল আচরণ আমাদের নূ্যনতম আশা। সেটা এখন আমরা পাচ্ছি না। ভারত যেন তাদের অবস্থান বদলায়। একইভাবে চীনের কাছে বলা উচিত- একাত্তর সালে তাদের বিতর্কিত ভূমিকার পরেও বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলেছি। এখন একটা সুযোগ এসেছে আমাদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার। এ ছাড়াও চীনের স্বার্থগত চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দিক থেকে। চীনের চাহিদাকে একেবারেই উড়িয়ে না দিয়ে বিবেচনার মধ্যে রাখা উচিত। শর্ত সাপেক্ষে তাদের চাহিদার বিষয়গুলো আমরা লেনদেনের মধ্যে আনতে পারি। বলতে পারি, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের সমর্থন করলে তাদের কিছু পাওয়ার আশা আছে। অন্যের স্বার্থ বিবেচনা করে চীনের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কে যাব না, এটা তো একটা স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূমিকা হতে পারে না। সেই রাষ্ট্র যদি আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিত তাহলে অন্য কথা ছিল। তার কাছ থেকেও তো কিছু পেলাম না।

সি আর আবরার

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × five =