আবু তাহের, টেকনাফ থেকে:

মিয়ানমারের মংডু উপকূলে ধাওনখালী সৈকতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় সাগরের জোয়ারের পানিতে তাদের জীবন বিপম্ন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা সর্বাধিক।

মংডুর ওই সৈকতে আশ্রয় নেওয়া শামশুল আলম নামে এক রোহিঙ্গা গতকাল শনিবার টেলিফোনে জানিয়েছেন, প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা এখানে একটি চরে এক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছে। রাখাইনের বুচিদংয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে তারা এখানে সৈকতে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে তারা। নৌকার অভাবে তারা সমুদ্র পাড়ি দিতে পারছে না। আশ্রয় নেওয়া এই রোহিঙ্গারা এখানে পলিথিনের ছোট ছোট শেড তৈরি করে ছিল। তিনি জানান, শুক্রবার রাত থেকে উপকূলে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে জোয়ারের পানি।

শামশুল আলম জানান, শুক্রবার মধ্য রাতে জোয়ারের পানিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়া পলিথিনের তৈরি সব শেড তলিয়ে গেছে।

এই সময়ে শিশুদের কোলে বা কাঁধে নিয়ে রোহিঙ্গারা পানিতেই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিল। জোয়ারের পানি নেমে গেলে তারা চরের ওপর উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করছে। টেলিফোনে ওই রোহিঙ্গা জানান, শনিবার সকালে তারা সেখানে একটি বালুর বাঁধ তৈরি করে জোয়ারের পানি ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বাঁধটি পানিতে ভেঙে গেলে তাদের জীবন বিপম্ন হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এখানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পেছনের দিকে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। কারণ, তাদের পেছনে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া।

সাব্বির আহমদ নামে এক রোহিঙ্গা ওই স্থান থেকে একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছেন। এতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকশ’ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ সৈকতে বালু দিয়ে একটি বাঁধ তৈরি করছে। জোয়ারের পানি এসে বাঁধে আঘাত করলে রোহিঙ্গারা ফের বাঁধের ভাঙন মেরামত করে। বাঁচার জন্য সাগরের জোয়ারের পানির সঙ্গে মরণপন যুদ্ধ করছে তারা। ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘আমরা চরম বিপদের মধ্যে রয়েছি। আমাদের কোথাও যাওয়ার রাস্তা নেই। আমাদের নারী ও শিশুদের বাঁচানোর জন্য কিছু করুন।’

এদিকে বঙ্গোপসাগরে কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূলে ৩নং সতর্ক সংকেত রয়েছে। সাগরের ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় মংডুর উপকূলে চরে আটকেপড়া ১২ হাজার রোহিঙ্গার জন্য উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া তাদের আত্মীয়স্বজন উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে।

টেকনাফের শামলাপুরে আশ্রয় নেওয়া শফিক আহমদ নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘মংডুর ধাওনখালী সৈকতে আটকেপড়াদের মধ্যে আমার এক ভাই ও তার পরিবারের ৮ সদস্য রয়েছে। তারা এদিকে বাংলাদেশেও আসতে পারছে না, আবার পেছনের দিকেও যেতে পারছে না। ঝড়-বৃষ্টি, জোয়ারের পানিতে তারা চরম বিপদের মধ্যে রয়েছে।’

উখিয়া ও টেকনাফে গতকাল সকাল থেকে ঝড়ো বাতাসে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়া পলিথিনের শেডগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে বিকেলে বৃষ্টি নামলে তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। কাদাপানিতে একাকার হয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের বস্তি। শুক্রবার সারা দিনও থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।

জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর এবং এফএও-এর উদ্যোগে কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্পে অন্তত ৩০টি স্থানে রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার রান্না করা হচ্ছে। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান টান বলেন, ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। তাদের রান্নার সমস্যা হচ্ছে। আমরা সাধ্য মতো চেষ্টা চালাচ্ছি।

উখিয়া সীমান্তে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষমাণ উখিয়া থেকে আবদুর রহমান জানান, উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে নাফ নদের ওপারে প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। মিয়ানমার সেনাদের অভিযানের মুখে পড়ে প্রাণে বাঁচতে এপারে আসার সুযোগ খুঁজছে তারা। গতকাল শনিবার বিকেলে উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে গিয়ে বিজিবি ও স্থানীয়দের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিকেল ৪টার দিকে উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া খালের নৌকা নিয়ে রোহিঙ্গা পারাপার করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন মো. জামশেদ নামে মাঝি। তিনি জানান, প্রতিদিন এ সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। ওই সীমান্ত চৌকির বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, এ সীমান্তের ওপারের কোয়ানচিং পাড়ায় প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষা করছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যাবে না।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে অধিকাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সেখানে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশে অপেক্ষায় রয়েছে বলে আমি শুনেছি।’

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

fifteen − 11 =