গত আগস্টের ঘটনা। শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজ জিতেও একটা জায়গায় অতৃপ্ত ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি। স্লিপের ক্যাচিংটা যে কিছুতেই ঠিকঠাক হচ্ছে না! তাঁর নিজের হাত থেকেও পড়েছে সহজ ক্যাচ। সিরিজ শেষে কোহলি স্বীকার করেছিলেন, ‘এই জায়গাটিতে আমাদের অবশ্যই উন্নতির সুযোগ আছে।’

চট্টগ্রাম টেস্ট শেষে কি একই কথা শোনা যাবে মাহমুদউল্লাহর কণ্ঠেও! বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ে ওই স্লিপে দাঁড়ানোদের হাতই যে সবচেয়ে পিচ্ছিল! পিচ্ছিল বললে অবশ্য পুরোপুরি সঠিক বলা হবে না। কারণ, পিচ্ছিল তো বলা যাবে তখন, যখন বল হাতে পড়ে বেরিয়ে যাবে। বাংলাদেশের স্লিপ ফিল্ডাররা তো বেশির ভাগ সময় বলে হাতই লাগাতে পারেন না। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে আসা বল কখনো দুই স্লিপের ফাঁক দিয়ে, কখনো ফিল্ডারদের পা গলে চলে যাচ্ছে বাউন্ডারির দিকে।

চট্টগ্রাম টেস্টেই কাল পর্যন্ত এ রকম দৃশ্য দেখা গেছে তিনবার। শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসটা যে ক্রমেই লম্বা হচ্ছে, সেটির অন্যতম কারণ স্লিপের ফিল্ডারদের ব্যর্থতা। কখনো মেহেদী হাসান মিরাজের হাত থেকে, কখনো ইমরুল কায়েসের পাশ দিয়ে, কখনোবা দুজনকেই ফাঁকি দিচ্ছে বল। এই সুযোগে শ্রীলঙ্কার দুই ব্যাটসম্যান দনাঞ্জয়া ডি সিলভা ও কুশল মেন্ডিস সেঞ্চুরি পেরিয়েও করে ফেলেছেন ক্যারিয়ার-সর্বোচ্চ রান।

সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও স্লিপের ফিল্ডারদের ব্যর্থতা প্রকটভাবে চোখে পড়েছে। নিউজিল্যান্ড সফরের ওয়েলিংটন টেস্টে তাসকিন আহমেদের বলে জিত রাভালের সহজ ক্যাচ ফেলেছিলেন সাব্বির। একই টেস্টে কামরুল ইসলামের বলে ল্যাথামের ক্যাচ নিতে পারেননি মিরাজ। ক্রাইস্টচার্চের দ্বিতীয় টেস্টে স্লিপে ক্যাচ পড়ে চারটি। পালা করে রাভাল, রস টেলর, টিম সাউদি ও ওয়াগনারের ক্যাচ ছেড়েছেন স্লিপের ফিল্ডাররা। দু-একটি ছাড়া এর সবই ছিল সহজ ক্যাচ। গত বছরের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও ফিল্ডিংয়ের এই জায়গাটিতেই বেশি ছিদ্র খুঁজে পেয়েছেন স্বাগতিক ব্যাটসম্যানরা।

টেস্ট ক্রিকেটে ১৭ বছর পার করেও স্লিপ ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশের দুর্বলতা রয়েই গেছে। টেস্টের ব্যাটিং–বোলিং হয়তো খেলোয়াড়েরা কিছু শিখেছেন। কখনো কখনো এসব জায়গায় অতিমানবীয় পারফরম্যান্সও করে ফেলেন তাঁরা। কিন্তু টেস্টে যে স্লিপ ফিল্ডিংটাও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, সেটি যেন মাথায়ই নেই!

আরও পড়ুনঃ   ভারতে অস্ট্রেলিয়ার টিম- বাসে হামলা

দ্রুত রিফ্লেক্সের কারণে যুগে যুগে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরাই স্লিপে ফিল্ডিং করে এসেছেন। মার্ক ওয়াহ, রাহুল দ্রাবিড়, মার্ক টেলর, মাহেলা জয়াবর্ধনে এ কালের স্টিভ স্মিথরাই তার উদাহরণ। অথচ বাংলাদেশে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একমাত্র ইমরুল কায়েসকেই ওই জায়গায় দাঁড়াতে দেখা যায়। সেটিও নাকি তাঁকে জোর করে দাঁড় করানো হয় বলেই! মাঝে থিতু হয়ে গিয়েছিলেন সৌম্য সরকারও। এখন তো তিনি দলেই নেই। নেই দলের সেরা ফিল্ডার সাব্বির রহমানও। এই সিরিজে ইমরুলের পাশে দাঁড়াচ্ছেন মিরাজ। অথচ দুজনের কেউই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান নন। তবু উপায় নেই। টপ অর্ডার যাঁরা আছেন, তাঁরা নাকি ক্যাচ ছেড়ে গাল খাওয়ার ভয়েই স্লিপে দাঁড়াতে চান না!

রিফ্লেক্স ভালো থাকলে বা চর্চা করলে অন্য ব্যাটসম্যানরা স্লিপে দাঁড়াতে পারেন না, তা নয়। কিন্তু বাংলাদেশ দলে সে রকম ফিল্ডার কোথায়! দলের সঙ্গে নিয়মিত একজন বিশেষজ্ঞ ফিল্ডিং কোচ থাকলেও স্লিপের ফিল্ডিং নিয়ে আলাদা কাজ হয়নি কখনোই। যেটুকু হয় সেটি নিয়মিত অনুশীলনের অংশ হিসেবে। কাল দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদও স্বীকার করেছেন, ‘এই দলে অত স্লিপ ফিল্ডার নেই, এই দুজনই (ইমরুল ও মিরাজ) আছে। দুজনকে নিয়েই অনেক কাজ করা হয়েছে। দলে বিশেষজ্ঞ স্লিপ ফিল্ডার থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সব টেস্ট দলেই এটা আছে। এই জায়গায় কাজ করা যেতেই পারে।’

কাজটা হতে পারত ঘরোয়া ক্রিকেটেও। কিন্তু যেখানে বোলিং আক্রমণ সাজানো হয় স্পিনারদের নিয়ে, সেখানে স্লিপ আসবে কোত্থেকে! পেস বোলারদের বলও তেমন ওঠে না যে স্লিপের ফিল্ডিং নিয়ে মনোযোগী হবে দলগুলো। বাংলাদেশ দলের ‘স্লিপ কর্ডন’টাও তাই ছেঁড়া জালই হয়ে থাকছে!

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 + 9 =