ষষ্ঠ পোপ ফ্রান্সিসের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারে পেতে রাখা ‘কূটনৈতিক বোমাক্ষেত্র’ (ডিপ্লোম্যাটিক মাইন-ফিল্ড) সফরে যাচ্ছেন তিনি। কঠিন সমস্যা সেখানে তিনি কিভাবে মোকাবিলা করেন সেদিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব। রোববার মিয়ানমার সফরে আসছেন তিনি। অবস্থান করবেন ২রা ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি মিয়ানমারের বেসামরিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করবেন।
বিশেষ করে তার আলোচনায় প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু।এ ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ তো একে জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ ইস্যুকে পোপ কিভাবে মোকাবিলা করেন এখন কূটনৈতিক বিশ্ব সেদিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ভয়েস অব আমেরিকা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতি নিধনের অভিযোগ এনেছে। এমন প্রেক্ষিতে সেখানে সফরে আসছেন সারা বিশ্বে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সিনিয়র ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস। রয়টার্স লিখেছে, তিনি বাংলাদেশও সফর করবেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধকে মানবতার বিরোধী অপরাধ বলে আখ্যায়িত করেছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, জোর করে বাস্তুচ্যুত করাসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। এর জন্য দায়ী করা হয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে। তবে তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পোপ ফ্রান্সিসের এ সফরটি এতটাই স্পর্শকাতর যে, তার উপদেষ্টারা এ সময়ে তাকে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে করে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয় এবং তার প্রেক্ষিতে দেশটির সেনাবাহিনী ও সরকার সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে চলে যায়। তার সফরের সবচেয়ে উত্তেজনাকর বা স্পর্শকাতর মুহূর্ত হতে পারে সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে এবং আলাদা করে বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচির সঙ্গে প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত বৈঠকের সময়। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে অভিহিত করে না। তারা তাদেরকে বাঙালি হিসেবে অভিহিত করে। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসী। তাই তাদের কোনো নাগরিকত্ব দেয় না মিয়ানমার। ফলে পোপ ফ্রান্সিস এখন এক উভয় সঙ্কটের মধ্যে এই ‘মাইন ফিল্ডের’ ভিতর পা রাখছেন। মিয়ানমারের ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশে মাত্র ৭ লাখ হলো রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান। এ বিষয়ে রিলিজিয়ন নিউজ সার্ভিসের একজন প্রথম সারির মার্কিন লেখক ও গবেষক ফাদার থমাস রিস বলেছেন, তার নৈতিককতা নিয়ে তাকে এই সফরে সমঝোতা করতে হবে। না হয় ওই দেশে বসবাসকারী খ্রিস্টানদেরকে তিনি বিপদের মুখে ফেলে দেবেন। তাই তার সামনে এখন ঝুঁকি। তিনি বলেন, পোপের প্রতি ও তার ক্ষমতার প্রতি আমার ভীষণ শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে এই সফর নিয়ে তাকে কারো পরামর্শ দেয়া উচিত। ভ্যাটিক্যানের সূত্রগুলো বলছে, হলি সি বিশ্বাস করে, পোপের এই সফরটা খুব দ্রুততার সঙ্গে তাড়াহুড়া করে নেয়া হয়েছে মে মাসে। পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর অং সান সুচির সফরের সময় এ সিদ্ধান্ত হয়। ব্রুকলিনস ইন্সটিটিউশনের সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া পলিসি স্টাডিজের ফেলে লিন কুওক বলেছেন, সব ফ্রন্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে পোপকে। একদিনে নিরাপত্তা বা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া সহিংসতা থামানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে সুচিকে একদম মুক্তহস্ত করে দেয়াও ঠিক হবে না। পোপের এই সফরের শেষ প্রান্তে তিনি ঢাকায় অবতরণ করবেন। সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলবেন। গত সপ্তাহে মিয়ানমারের কাছে একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন পোপ। এতে তিনি বলেছেন, তিনি প্রত্যাশা করেন এই সফর হবে পুনঃএকত্রীকরণ, ক্ষমা করে দেয়া ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। তবে এখানে লক্ষ্যণীয় এ বছর ভ্যাটিক্যান থেকে দু’দফা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আপিল করা হয়েছে। তাতে প্রতিবারই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ শব্দটি কি মিয়ানমারে উচ্চারণ করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ভ্যাটিক্যানের মুখপাত্র গ্রেগ বারকি বলেছেন, পোপ ফ্রান্সিসকে  গুরুত্বের সঙ্গে এসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

two × 2 =