আবু তাহের, উখিয়া থেকে:

উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত ক্যাম্পের সামনে সড়কের ওপর রোহিঙ্গা শিশুদের বেশ জটলা। কোনো গাড়ি অথবা পথচারীর দেখা পেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এসব শিশু। তারা হাত বাড়িয়ে ধরছে ত্রাণের আশায়। এই দৃশ্য গতকাল বুধবার সকাল ১০টার দিকের। ভিড়ের এক পাশে দেখা গেল ১ বছরের শিশু নাছিরকে। ৭ বছরের বোন আছমার কোলে চড়ে রাস্তায় নেমেছে সে। প্রতিবেদককে কাছে পেয়েই বাড়িয়ে দিল তার ছোট্ট হাতটি। মুখে কোনো ভাষা না ফুটলেও তার চোখে-মুখে করুণ আকুতি। ছোট্ট ভাইটির এ দৃশ্য দেখে ফিক করে হেসে ফেলল তার বোন। আছমা জানায়, প্রতিদিন সে এখানে ভিক্ষা করতে আসে। তার দেখতে দেখতে ছোট ভাইটিও হাত পাতা শুরু করেছে। ভাগ্যে কিছু জুটলেই তা দিয়ে হয় পরিবারের খাবার। ক্যাম্পের একটি ঘরে রয়েছে তাদের মা এবং আরও দুই বোন। তার বাবা ছৈয়দ নুরকে মিয়ানমার সেনারা হত্যা করেছে বলে জানায় সে।

আছমা জানাল, আট-দশ দিন আগে তারা কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছে। তাদের মা ও বড় দুই বোন নিবন্ধন সম্পম্ন করেছে। এর মধ্যে ত্রাণ পেয়েছে একবার। তা দিয়ে তাদের মাত্র চারদিন
চলেছে। বাকি দিন গেছে তাদের অনাহার-অর্ধাহারে। শুধু আছমা নয়; এমন হাজার হাজার রোহিঙ্গা  রয়েছে অভুক্ত। প্রতিদিনই তারা ছুটছে ত্রাণের আশায়।
ত্রাণের মজুদ সম্পর্কে জেলা প্রশাসন জানায়, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত নগদ ২ কোটি ৪২ লাখ ৯১ হাজার টাকা জমা আছে। এ ছাড়া মজুদ রয়েছে চাল ৯৩০ টন, ডাল ৮২ টন, তেল ৯৯ হাজার লিটার, লবণ ৬৭ টন, চিনি ৮৯ টন, দুধ ৮২ হাজার কেজি, টিন ৪৮৯ বান্ডেল এবং ৫১১টি তাঁবু।

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়কারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) মাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণের পরিমাণ এখন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। বিভিন্ন স্থানে ৬টি গুদামে সরকারি বরাদ্দ যে ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে তা পর্যায়ক্রমে চাহিদামতো বিতরণ করা হচ্ছে। বেসরকারি যে ত্রাণসামগ্রী আসছে তা সরাসরি ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে। সেনাবাহিনী তা গ্রহণ করে বিতরণের ব্যবস্থা করছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের সামনে মহাসড়কের পাশেই একটি স্থানকে বাঁশের ঘেরা দিয়ে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র করা হয়েছে। সেখানে ৫ শতাধিক লোকের দীর্ঘ লাইন। সবাই টোকেন হাতে নিয়ে ত্রাণের জন্য দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে। এ কেন্দ্রের বাইরে ভিড় করেছে আরও হাজার দু’য়েক মানুষ। এদের বেশির ভাগই নতুন এসেছে। তারা খোঁজখবর নিচ্ছে কীভাবে ত্রাণ পাবে। এদেই একজন শামসুল আলম (৪৫)। পরিবারের ১০ জনকে নিয়ে রাখাইনের বুচিদং চিন্দিপ্রাং থেকে পালিয়ে এসেছেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে কুতুপালং ক্যাম্পে প্রবেশ করেছে শামসুল আলমের পরিবার। ঠাঁই হয়েছে প্রতিবেশী একজনের বস্তিঘরে, যিনি আগেই এসেছেন। শামসুল আলম জানান, রাতে কিছু চিড়া খেতে দিয়েছে তারা। গতকাল সকালেই তিনি বের হয়েছে ত্রাণের সন্ধানে। তার মতো আরও অনেক রোহিঙ্গা এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে ছুটছে ত্রাণের সন্ধানে।

ওই ক্যাম্পে দায়িত্বরত সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ক্যাম্পে ব্লকভিত্তিক সরেজমিন যাচাই করে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের টোকেন দেওয়া হচ্ছে। সেই টোকেনের মাধ্যমে বিতরণ কেন্দ্র থেকে ত্রাণ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিদিন নতুন করে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। এদের জন্য ত্রাণ বিতরণ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পম্ন করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের একটু দূরে বালুখালী ক্যাম্পের ১ নম্বর ব্লকের সামনেই কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের পাশে বিশাল এলাকা নিয়ে করা হয়েছে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা গেল ত্রাণের জন্য কয়েকশ’ লোকের দীর্ঘ সারি। বিতরণ কেন্দ্রের বাইরে ভিড় এর কয়েক গুণ। কিছুক্ষণ পর ত্রাণ নিয়ে একটি ট্রাক সেখানে পৌঁছানোমাত্র ঘিরে ধরে কয়েকশ’ রোহিঙ্গা। ট্রাকটিকে বিতরণ কেন্দ্রের দিকে যেতে দিচ্ছে না ভিড়ের লোকজন। তাদের সবার দাবি- না খেয়ে আছি, ত্রাণ চাই। ত্রাণ বিতরণ কাজে নিয়োজিত সেনা সদস্যরা ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা জানাচ্ছেন, টোকেন ছাড়া ত্রাণ হবে না। আর রোহিঙ্গাদের আকুল আবেদন- ত্রাণ দিতে হবে।

ওই কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণ কাজে নিয়োজিত আসাদুল হক নামে এক কর্মকর্তা বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ কাজ চলছে। তাদের চাহিদার শেষ নেই। এভাবে আর কতদিন পারা যাবে! হাজার হাজার লোককে সামাল দেওয়া কঠিন কাজ। তিনি জানান, এখন বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অনেকে কমে এসেছে। এক সপ্তাহ আগেও মহাসড়কে ত্রাণবাহী যানবাহনের দীর্ঘ জট ছিল। এখন মহাসড়ক রোহিঙ্গাদের দখলে। সেখানে ত্রাণবাহী যানবাহনের সংখ্যা অনেক কম।
থাইংখালী ইউনিয়নের হাকিমপাড়া ক্যাম্পে প্রবেশ পথের একটু পরেই একটি মসজিদ। মসজিদের মাঠকে ব্যবহার করা হচ্ছে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে। মসজিদের বারান্দায় ত্রাণসামগ্রী রেখে বিতরণ করছেন সেনা সদস্যরা। সঙ্গে রয়েছে যারা ত্রাণ নিয়ে এসেছে ‘এহয়া সুন্নাহ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠনের কর্মকর্তারা। সংগঠনের এক কর্মকতা মওলানা রায়হান আহমদ বলেন, তারা প্রায় দু’শ লোকের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সেখানে ভিড় করেছে আরও অনেক রোহিঙ্গা। তাদের বেশির ভাগই নতুন এসেছে। ত্রাণের জন্য তারা মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে।

ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র যোসেফ সূর্যমণি ত্রিপুরা বলেন, সীমান্তের কিছু পয়েন্টে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের টোকেনের মাধ্যমে আমরা তাৎক্ষণিক জরুরি খাবার ও ওষুধপত্র দিয়ে থাকি। কিন্তু আরও অনেক রোহিঙ্গা যারা নজর এড়িয়ে বাংলাদেশে ঢুকে যাচ্ছে তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তারা মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। এদের অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গিয়ে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে ভিড় করছে।
অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আরও ৪০ হাজার রোহিঙ্গা উখিয়া প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল থামছে না। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় উখিয়ার আনজুমানপাড়া সীমান্তের জিরো লাইনে গত তিন দিন ধরে অবস্থান করছেন প্রায় ৪০ হাজার নারী-পুরুষ। বিজিবি সীমান্তে কিছুটা কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তারা আটকা পড়েছেন নোম্যান্স ল্যান্ডে। তবে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও মানবিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। যদিও গতকাল বুধবার পর্যন্ত এসব রোহিঙ্গার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিজিবি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, আনজুমানপাড়া সীমান্তে ৩০-৪০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা আটকে পড়েছে। এসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে রোদ-বৃষ্টিতে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গারা মানবিক সংকটে রয়েছে বলে জানান ইউএনএইচসিআরের মূখপাত্র যোসেফ সূর্যমণি ত্রিপুরা। তিনি বলেন, সীমান্তে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯ হাজার টোকেন বিতরণ করা হয়েছে। টোকেনের মাধ্যমে তাদের জরুরি সাহায্য দেওয়া হবে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × two =