সাব্বির নেওয়াজ ও আবদুর রহমান, টেকনাফ থেকে:

প্রাণ বাঁচাতে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে এপারে এসে এখন তীব্র জীবনযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে অসহায় রোহিঙ্গারা। তিনবেলা খাবার জোটাতে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রের ত্রাণ বিতরণের বুথগুলোতে। অবশ্য আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে এখনও রয়ে গেছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। তারা দিনে টেকনাফ রোডে, আর রাতে জঙ্গল অথবা পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে হাজারো পরিবার মহাসড়কের দুই পাশজুড়ে দিনভর অপেক্ষা করে। কাউকে দেখলে অসহায়ের মতো দুটি হাত বাড়িয়ে দেয় ত্রাণ পাওয়ার আশায়।

টেকনাফ থেকে উখিয়া যাওয়ার পথে সড়কের পাশে জাদিমুড়া নামক স্থানে শনিবার সকালে কথা হয় নূর মহলের (৩১) সঙ্গে। নিজের চারটি আর বোনের তিনটি শিশু সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়েছেন সকালের খাবারের আশায়। জানতে চাইলে হাত উঁচিয়ে সড়কের পাশে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমি দেখিয়ে বললেন, ‘রাতে ওইখানে শুয়ে ছিলাম। নিজের বোরকা বিছিয়ে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়েছি। মশার কামড়ে ঘুম আসে না।’

নূর মহলের মতো সড়কের পাশে দিনে, আর রাতে জঙ্গলে অথবা পাহাড়ের পাদদেশে জীবন কাটছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের।

দিনের তীব্র তাপদাহের কারণে রাতেও গরম হয়ে থাকে পাহাড়ের পাদদেশ। এমনকি পলিথিনের কোনো তাঁবুও নেই সেখানে। এমন প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে ঠাঁই হয়েছে শিশুদেরও। এসব শিশুর অন্তত ৬০ ভাগই কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত। কিন্তু দিনের আলো ফুরিয়ে আঁধার নামলেই সবকিছু ছাপিয়ে অসুস্থ শিশুদের আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে যে কারও বুক। এমন হাহাকার আর আর্তনাদ ঘুম কেড়ে নিয়েছে কাছাকাছি আশেপাশের বাড়িঘরের অন্য বাসিন্দাদেরও। কষ্টেসৃষ্টে প্রতিটি রাত কেবল ভোর হয়। এরই মধ্যে গত ক’দিনে এমন পরিবেশেই জন্ম নিয়েছে অন্তত দু’শতাধিক শিশু।

গতকাল দিনের বেলায় সূর্যের প্রখর রোদের মধ্যেই লেদা এলাকায় সড়কের পাশে ঠাঁই বসে ছিল রোহিঙ্গাদের অনেকেই। ক্ষুধা, তৃষষ্ণা, যন্ত্রণা, অসুখ, ক্লান্তি, ভয়, আহাজারি আর ফেলে আসা ভয়াল অতীত- কোনো কিছুই আর তাদের চিন্তিত করে না। দু’চোখে রাজ্যের অনিশ্চয়তা। আবার শুক্রবার রাতে পাহাড়ের কোল ঘুরে দেখা গেল এলোমেলো মানুষের দীর্ঘ সারি। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ-নবজাতক সবাই একসঙ্গে। কিংবা পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী পাশাপাশি। সারির পর সারি। পিচঢালা রাস্তার পাশ থেকে শুরু। সমতল হয়ে মিশে গেছে পাহাড়ের ঢালে, চূড়ায়। কারোরই মাথার ওপর নেই কোনো আচ্ছাদন। কাদামাটিতে বিছানোর মতো এক টুকরো মাদুরও নেই। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে পড়েছে নিরুপায় বাস্তুচু্যতরা। ছোট্ট স্থানে সবার জড়োসড়ো হয়ে রাত কাটানোর প্রস্তুতি। মল-মূত্র ত্যাগ তাদের পাহাড়ের পাদদেশেই।

প্রশাসনের ঘুম নেই : শনিবার সকালে টেকনাফ উপজেলা পরিষদে গিয়ে দেখা গেল, শরণার্থীদের জন্য রাম্না করা খাবার তৈরি হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক রাম্নার তদারকি করছিলেন। তিনি সমকালকে জানালেন, উপজেলার তিনটি স্থান থেকে রাম্না করা খাবার রোহিঙ্গাদের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এ তিনটি স্থান হলো উনছিপ্রাং, পৌর এলাকা ও বাহারছড়া। এ ছাড়া ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে উনছিপ্রাং, লেদা, বাহারছড়া ও সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী থেকে।

ইউএনও জানান, টেকনাফের বিভিম্ন পয়েন্ট দিয়ে শারণার্থীর আসা এখন একেবারে কমে গেছে। এখনও বিচ্ছিম্নভাবে দুই-একটি পরিবার যা আসছে, তারা উখিয়ার বিভিম্ন পয়েন্ট দিয়েই ঢুকছে। তিনি জানান, গতকাল থেকেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে তারা ত্রাণ কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও (এনজিও) স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিম্ন কাজে সম্পৃক্ত।

সরেজমিন দেখা গেছে, লেদা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছেন সেনা সদস্যরা। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণের বিভিম্ন পয়েন্টে গাড়ি যাওয়ার জন্য রাস্তা তৈরির কাজ করছিলেন তারা।

দমদমিয়া এলাকায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে ত্রাণ বিতরণের রাস্তা তৈরির কাজ করছিলেন স্থানীয় হ্নীলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদ আলী। তিনি জানালেন, আজ রোববার থেকে পুরোদমে ত্রাণ বিতরণ কাজ শুরু হবে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করবেন সেনা সদস্যরা। তিনি জানান, অতিরিক্ত রোহিঙ্গার চাপে এলাকায় সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। অনেকে বিচ্ছিম্নভাবে ত্রাণ বিতরণ করায় উখিয়া-টেকনাফ মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। মহাসড়কের দু’পাশের বন-জঙ্গলসহ বিভিম্ন খালি জায়গা থেকে মল-মূত্রের তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। স্যানিটেশন ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বসতি গড়তে রোহিঙ্গারা নিজেরাই কোথাও কোথাও পাহাড় কাটছে।

মৌচনি নয়াপাড়া আদর্শ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কয়েকজন সেনা সদস্য। পাশে ত্রাণ বিতরণের জন্য সড়ক তৈরি করা হচ্ছিল। এই বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে কথা হলো সদ্য স্বামী হারানো রোহিঙ্গা নারী সনজিদা বেগমের (২১) সঙ্গে। তিনি জানালেন, কয়েক দিন আগে রাখাইনরা সে দেশের সেনা সদস্যদের পোশাক পরে এসে তার স্বামী আবদুস সালামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। তিনি বাধা দিতে গেলে তাকেও ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। আবদুস সালামের বাহু ও গলায় কোপ দিয়ে, পরে ধমনী কেটে তাকে হত্যা করেছে তারা। পরে একমাত্র ছেলে ১ বছরের নুরুলকে নিয়ে এ দেশে পালিয়ে আসেন সনজিদা। একই স্থানে কথা হয় হালিমা খাতুনের (৪২) সঙ্গে। তিনি জানালেন, মংডুর হাসসুরাতায় তার বাড়ি। তিনি বিধবা। তার বাড়ির উঠোনে তার ছেলে সাইদুল হোসেনকে তার সামনেই কুপিয়ে হত্যা করে রাখাইনরা। পরে তার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ দুই নারীর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন লাঠিতে ভর দিয়ে কষ্ট করে হেঁটে সেখানে আসেন ৭০-ঊর্ধ্ব গুলবাহার। তিনি জানালেন, তার ছেলে আমান উল্লাহকে (৫০) বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় সেনারা। তার আর কোনো খোঁজ তিনি পাননি।

কারাগারে বন্দি বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা পুরুষ : উখিয়া ও টেকনাফের বিভিম্ন শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি পরিবারের ২/১ জন পুরুষ সদস্য মিয়ানমারের কারাগারগুলোতে বন্দি রয়েছে। রোহিঙ্গা নারীদের অভিযোগ, তাদের বেশিরভাগ স্বামীকে মিয়ানমার পুলিশ তুলে নিয়ে কারাগারে আটকে রেখেছে। কিন্তু গ্রেফতার তাদের কী অপরাধ, তা পুলিশ বলে যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত নদ নাফ পাড়ি দেওয়া অনেক নারী রোহিঙ্গা।

বর্তমানে চলমান সহিংসতার মাসতিনেক আগেও মিয়ানমারের আরাকানে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠেছিল। তখন মংডুর ছুমিলি গ্রামের শাফিনাজ বেগমের স্বামী আরিব হোসেনকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় কারাগারে। পুলিশ রোহিঙ্গাদের কারণে-অকারণে গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়ে যায়। তবে কতজন বন্দি আছে, তার সংখ্যা জানে না কেউ।

গত প্রায় এক মাসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকনাফ ও উখিয়ার ১২টি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। শরণার্থীদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীরা জানায়, ৫০ বছরের নিচের প্রায় সব পুরুষকেই হত্যা করা হয়েছে।

স্যানিটেশন ও খাবার পানির ব্যবস্থা হচ্ছে : নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ১২০০ স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও ১২০০ নলকূপ বসানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, তাদের হিসাবে ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে। এসব আশ্রয়প্রার্থী উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সরকারি উদ্যোগে খাদ্য, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্যানিটেশনসহ সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের সব বিভাগ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, শরণার্থীদের জন্য ১২০০ স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও ১২০০ নলকূপ বসানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫০০ স্যানিটারি ল্যাট্রিন ও ১০০ নলকূপ বসানো হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ৬০০ স্যানিটারি ল্যাট্রিন তৈরি করবে। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে রাম্না করা খাবার, চাল, শুকনো খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরকারের পাশাপাশি বিভিম্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও বিতরণ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়ার বালুখালীতে অস্থায়ীভাবে ১৪ হাজার শেড নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের ১১টি চেকপোস্ট থেকে গত ৫ দিনে ৫ হাজার ১১৯ জন রোহিঙ্গাকে বালুখালী শরণার্থী শিবিরে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 2 =