সিফাত বিনতে ওয়াহিদ:

ঢাকার রাস্তার দেয়ালগুলো যেন নানা কারণে দিন দিন রহস্যে ঘনীভূত হয়ে উঠছে। কিছুদিন আগেও মিরপুর-আগারগাঁওর অনেক দেয়ালে সুবোধ এর গ্রাফিতিই ছিল মানুষের আলোচনার বিষয়। এ আলোচনায় এবার নতুন করে যুক্ত হলো আরেকটি রহস্যজনক পোস্টার

ঢাকার তেজগাঁও, সার্ক ফোয়ারা, কারওয়ান বাজার, মগবাজার, সাইন্সল্যাব এবং ধানমন্ডিসহ বেশ কিছু এলাকার দেয়ালএকটি লাল রং এর পোস্টারে ছেয়ে গেছে। সেখানে সাদা হরফে লেখা আছে- নাবিলা জানো? তার নিচেই একটু ছোট করে লেখা- একজন মুমূর্ষ রোবটের জন্য রক্তের প্রয়োজন। রক্তের গ্রুপ (N+)। ঢাকার ব্যস্ততম এ এলাকাগুলোয় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করে, যাদের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এ পোস্টার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পৌঁছে ভাইরাল হয়ে উঠেছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরই মধ্যে এ পোস্টার নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই সুবোধের গ্রাফিতির সঙ্গে খুঁজে ফিরছে নাবিলার যোগসূত্র। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন একটা প্রশ্নই লোক মুখে ঘুরে ফিরে আসছে- কে এই নাবিলা? কেনই বা একজন রোবটের জন্য তার কাছে রক্ত চাওয়া হচ্ছে? মুমূর্ষ রোবট দ্বারা কী মানুষের বিমর্ষ রূপ বোঝানো হয়েছে, কিংবা ক্রমশ হৃদয়হীন হয়ে উঠা মানুষটাকেই বোঝানো হয়েছে? তবে কী সুবোধরা পালালে মানুষগুলো সব রোবট হয়ে উঠবে? আর তখনই কী প্রয়োজন পড়বে কোনো নারীর ছায়া অথবা আশ্রয়ের?

এর সঙ্গে আছে কী কোনো গভীর রাজনৈতিক সূত্র? এই যে মানুষের ক্রমশ বিবর্তন, জীবনযাত্রা মানুষকে দ্রুত থেকে দ্রুততম গতিতে অনুভূতি শূন্য করে ফেলছে- এর সঙ্গে কী কোনো সম্পর্ক আছে পোস্টারের এই রোবটের? যার প্রয়োজন রক্তের, সে রক্তের গ্রুপটি নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। এন পজেটিভ নামের কোনো ব্লাড গ্রুপ এর আগে কখনো কেউ শুনেছে কী? এন পজেটিভ দিয়ে কী বুঝানো হয়েছে তবে? এ রকম অসংখ্য প্রশ্ন এই একটি পোস্টারকে ঘিরে ক্রমশ ঘোলা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ওয়ালে হ্যাশ ট্যাগের মাধ্যমে নাবিলার কাছে অনেক মানুষই অনেক কিছু জানতে চাইছে। কারো কারো কাছে এটা হাস্যরসের বিষয় হলেও, কারো কারোর প্রশ্নে সমাজের অসঙ্গতিই উঠে এসেছে। একজন ফেসবুক ইউজার তার ওয়ালে হ্যাশ ট্যাগ দিয়ে নাবিলার কাছে জানত চেয়েছেন- নাবিলা জানো? চাল ৬০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৮০ টাকা কেজি, কাঁচামরিচ ২২০ টাকা কেজি। আরেকজন লিখেছেন- নাবিলা জানো? ঢাকা শহরে ব্যাচেলরদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না! একজন খুব আবেগে লিখেছেন- নাবিলা জানোতোমার আমার অবস্থান একই আকাশের নিচেকিন্তু দূরত্ব অনেক…। এ রকম অসংখ্য হ্যাশ ট্যাগ প্রতি মুহূর্তেই যুক্ত হচ্ছে ফেসবুকে। কিন্তু এর মাধ্যমে কী আর জানা যাবে, কে এই নাবিলা? কে-ই বা এ মুমূর্ষ রোগী, কেন তার এন পজেটিভ রক্ত প্রয়োজন, আর কি-ই বা তার উদ্দেশ্য?

তবে কী এ শুধুই এক পাগল প্রেমিকের কর্ম? নিজের প্রেমিকাকে কিছু বলতে চেয়েই কী তার এই পাগলামী? নাকি কোনো কর্পোরেট কোম্পানীর প্রোডাক্ট সেলের এটা একটি অভিনব পন্থা? এটা কী তাহলে কোনো সিনেমার প্রচারণার অংশ? কিছুই নিশ্চিত হচ্ছে না কেউ, শুধু অসংখ্য কী আর কেন প্রশ্ন হয়ে ঘুরছে ঢাকাবাসীর মগজে। হয়তো কিছুদিন পর সুবোধের মতো নাবিলাকে খুঁজতেও গোয়েন্দা বিভাগ তৎপর হয়ে উঠবে, কিন্তু কেনই বা আমাদের সুবোধকে পালাতে বলতে হয় অথবা পোস্টার লাগিয়ে নাবিলার কাছে প্রশ্ন খুঁজতে হয়? আমাদের সামাজিক অবক্ষয়তা কী মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্বই এতই বাড়িয়েছে যে আমরা মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলছি? আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত কী আজ এতই নড়বড়ে যে কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে? আরো কত কত সুবোধ আর নাবিলা সৃষ্টি হলে আমাদের সূর্যটা খাঁচা থেকে মুক্ত হবে? হবে কী?

Comments

comments

আরও পড়ুনঃ   অসময়ে ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

8 + 12 =