রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাশ করল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো তৃতীয় দফা বৈঠক। রাখাইনে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান গণহত্যা থামাতে মিয়ানমারকে কঠোর বার্তা দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কোনো কার্যকর পদক্ষেপের পক্ষে ছিল নিরাপত্তা পরিষদের তিন স্থায়ী সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। কিন্তু বাকি দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া বিপক্ষে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত এই বিভেদের মুখে কোনো প্রস্তাব আনা দূরে থাক, সাধারণ একটি বিবৃতি দেওয়াও সম্ভব হলো না নিরাপত্তা পরিষদের। অথচ জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে অধিকাংশ সদস্য দেশই রোহিঙ্গাদের ওপর অবিলম্বে সেনা সহিংসতা বন্ধ, নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, মানবিক সহায়তা এবং শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে। আনান কমিশনের সুপারিশ পূর্ণ বাস্তবায়নের পক্ষেও সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বিশেষ জোর দেন। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মতো উদারতা দেখানোয় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে সবাই। তবে আন্তর্জাতিক
মহলের চাপের তোয়াক্কা করছে না মিয়ানমার। বরাবরের মতো জাতিসংঘসহ বিভিম্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনের নিন্দা ও উদ্বেগকে নির্লজ্জের মতো পাশ কাটিয়ে গেলেন মিয়ানমারের জাতিসংঘ প্রতিনিধি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উ থাউং তুন। এবারও রোহিঙ্গা নিধনের জন্য দায়ী মিয়ানমারের নৃশংস সেনাবাহিনীরই সাফাই গাইলেন তিনি।
নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠক নিরাশ করলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলের কর্মপন্থার একটি রূপরেখার আভাস মিলেছে। সবাই তিনটি বিষয়ে যে একমত তা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করা, মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সব বাধা সরিয়ে নেওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সব পক্ষের অংশগ্রহণে রাজনৈতিক সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। বলিভিয়া, ইথিওপিয়া, মিসর, ইতালি, জাপান, সেনেগাল, কাজাখস্তান, সুইডেন, ইউক্রেন ও উরুগুয়ের প্রতিনিধিদের মাঝে এ অভিমতের প্রতিফলন ঘটেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত ১টায় বৈঠকের শুরুতেই রোহিঙ্গা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে শিগগির রাখাইনে সেনা সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার না থাকাই এ সংকটের মূল কারণ। সমাধানের পূর্বশর্ত হিসেবে অবশ্যই তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে অবিলম্বে শুরু করতে হবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ। এ ক্ষেত্রে ১৯৯৩ সালের মিয়ানমার-বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন চুক্তি আর যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তবে রাখাইনে মানবাধিকার কর্মী ও গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশের দাবির পাশাপাশি তিনি বিশেষ জোর দেন কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পরিপূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে উদারতার পরিচয় দেওয়ার জন্য আবারও বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।
নিরাপত্তা পরিষদের সাত সদস্যের অনুরোধে আয়োজিত এই বৈঠকে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যরা বক্তব্য রাখে। সংশ্নিষ্ট দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে অংশ নেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তুলে ধরে দ্রুত শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকারকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হলেও রাখাইনে এখনও তা বন্ধ হয়নি।
তবে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করতে নির্জলা মিথ্যাচারে পিছপা হননি মিয়ানমার প্রতিনিধি উ থাউং তুন। রোহিঙ্গা সংকটের জন্য সন্ত্রাসবাদকে দায়ী করে তিনিও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিথ্যাচারেরই প্রতিধ্বনি করলেন। মিয়ানমার প্রতিনিধি বলেন, রাখাইনে কোনো জাতিগত নিধন চলছে না, গণহত্যার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। গত ৫ সেপ্টেম্বরেই শেষ হয়ে গেছে সেনা অভিযান। ভাষণে মিয়ানমার প্রতিনিধি জাতিসংঘ মহাসচিবকে রাখাইন সফরের আমন্ত্রণ জানান।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় যুক্তরাষ্ট্র। মাত্রাতিরিক্ত সহিংসতার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে দায়ী করেন জাতিসংঘে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিক্কি হিলি। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, কূটনৈতিকভাবে ভালো কথা চালিয়ে যাওয়ার দিন ফুরিয়েছে। কূটনৈতিক পথে হবে না। এবার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কথাও ভাবা উচিত। রাখাইনে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের হত্যা ও ধর্ষণের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন নিক্কি হিলি। যতদিন না সহিংসতা বন্ধ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে ততদিন মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি না করারও আহ্বান এসেছে তার কাছ থেকে।
তবে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় মিয়ানমারের ওপর থেকে তুলে নেওয়া বিভিম্ন নিষেধাজ্ঞা নতুন করে আরোপের যে হুমকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দিয়েছিল, সে প্রসঙ্গ আর টানেননি হিলি। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ একটি নৃগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে যে নির্মম অভিযান চালাচ্ছে সে কথা বলতে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। তার ভাষায়, ‘(সেনাবাহিনীর) যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাদের অবশ্যই দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং অপরাধের জন্য বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি ম্যাথিও রাইক্রফট মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং এর প্রধান মিন অং হদ্মাইংকে দায়ী করেন। তিনি শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের তাগিদ দেন। রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানসহ তাদের নাগারিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন ব্রিটিশ প্রতিনিধি। তিনিও কফি আনান কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে জোর দেন।
আরেক স্থায়ী সদস্য ফ্রান্সের প্রতিনিধি তার প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন। তবে সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সমাধানের ওপরই জোর দেন তিনি। রাখাইনে ও বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা বলেন। সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করতে শিগগির রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করার তাগিদ দেন ফরাসি প্রতিনিধি।
রাখাইনে চলা সহিংসতার নিন্দা জানালেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে বেশি চাপ দিতে নারাজ রাশিয়া। বেশি চাপ দিলে মিয়ানমার সরকার আরও বেশি আগ্রাসী আচরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন জাতিসংঘে রাশিয়ার স্থায়ী দূত ভ্যাসিলি এ নেবেনজিয়া। কোনো ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আন্তর্জাতিক মহলকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। মিয়ানমারের প্রতি নমনীয় রাশিয়ার প্রতিনিধি মনে করেন, রাখাইনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সমাধানের পর্যায় থেকে এখনও অনেক দূরে। ভ্যাসিলি আরও বলেন, মিয়ানমার সরকার রাখাইন পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করছে। এ সময় বিদ্রোহী আরসাকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অভিহিত করে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের জন্য সেনাবাহিনী নয়, বরং তাদেরই দায়ী করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিয়ানমারের একটি দীর্ঘকালীন ও জটিল সংকট অভিহিত করে রুশ দূত এর রাজনৈতিক সামাধানের ওপর জোর দেন। এই প্রতিনিধি মিয়ানমারের সব জাতি ও ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে এ লক্ষ্যে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। এ সময় বাংলাদেশের চেষ্টারও প্রশংসা করেন ভ্যাসিলি।
রাশিয়ার মতো সহিংসতার নিন্দা জানালেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চীন। চীনা রাষ্ট্রদূত শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার প্রতিই সমর্থন জানান। চীন মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের আশু সমাধান নেই। তারা এ সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংলাপের পক্ষপাতী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে উল্লেখ করে চীনের জাতিসংঘ প্রতিনিধি উপ-রাষ্ট্রদূত উ হাইতাও বলেন, মিয়ানমার সরকারের দিকে পক্ষপাতহীন চোখে তাকানো দরকার। এ ক্ষেত্রে জটিলতা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক মহলের ধৈর্য ধরা উচিত বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি এ সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা দেওয়াও উচিত বলে মন্তব্য করেন চীনের এই প্রতিনিধি। তবে তিনি রাখাইনে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেন। পাশাপাশি তিনি এও মনে করেন, মিয়ানমার ধাপে ধাপে সেদিকেই এগোচ্ছে। এ সময় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই দেশকেই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বলে উল্লেখ করেন চীনের প্রতিনিধি হু হাইতাও। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের অবস্থান বরাবরই মিয়ানমার রাষ্ট্রের অনুগামী। রাখাইন পরিস্থতিকে বিভিম্ন পক্ষের সংঘাত আকারে দেখে থাকে চীন।
২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

সূত্রঃ

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 + fourteen =