কামরান সিদ্দিকী: পর্যটন খাতের অপার সম্ভাবনা বিবেচনায় দুই যুগ আগে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু শিল্প খাত এগিয়ে গেলেও পর্যটনে শিল্পের ছোঁয়া লাগেনি। এমনটাই মনে করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। যুগোপযোগী পর্যটন নীতি প্রণয়ন করে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও স্বাধীনতার চার দশক পরও সেই নীতি আইনে পরিণত হয়নি। টেকসই উম্নয়ন নিশ্চিত করতে নীতির পাশাপাশি আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। এই প্রেক্ষাপটে ‘টেকসই পর্যটন উম্নয়নের মাধ্যম’কে প্রতিপাদ্য করে আগামীকাল বুধবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হবে বিশ্ব পর্যটন দিবস।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৪৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) গোড়াপত্তন হয়। ১৯৯২ সালে প্রণিত জাতীয় পর্যটন নীতিমালায় পর্যটনকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সে নীতিমালা হালনাগাদ করে ২০১০ সালে আরও যুগোপযোগী করা হয়। নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ে এর বাস্তবায়নে গৃহীত প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পর্যটন আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, ‘দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য উম্নত পর্যটন সেবা প্রদান এবং পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্নিষ্ট সকল সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশে নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং সময়ে সময়ে বিদ্যমান আইনসমূহ হালনাগাদকরণ’। এরপর সাত বছর পার হলেও পর্যটন নীতি বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপটি উপেক্ষিতই থেকেছে।

বেসরকারি বেঙ্গল টু্যরসের নির্বাহী পরিচালক মাসুদ হোসেন সমকালকে বলেন, দেশে একটি ভালো পর্যটন নীতি থাকলেও পর্যটন আইন করতে না পারাটা দুর্ভাগ্যজনক। আইন থাকলে রিসোর্ট, হোটেল, টু্যর অপারেটর সবাইকে নিয়মের মধ্যে এনে পরিচালনা সহজ হতো। পার্বত্য অঞ্চলে হোটেল, রিসোর্ট হচ্ছে, কিন্তু আইন মেনে হচ্ছে কি? আইন মেনে হলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এভাবে অভিযোগ আসত না। তিনি আরও বলেন, কোনো বিদেশি পর্যটক প্রতারণার শিকার হলে তাকে সাধারণ ফৌজদারি মামলা করতে হয়। কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে অফ-সিজনে কর্মচারীদের ছাঁটাই করে দেন হোটেল মালিকরা। তাদের কথা বলার জায়গা নেই। দেশে নৌ-পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পর্যটকবাহী জাহাজ কীভাবে চলবে সে ব্যাপারে কিছু বলা নেই।

আরও পড়ুনঃ   মিয়ানমারের মেয়েকে বিয়ে: রিট খারিজ করে এক লাখ টাকা জরিমানা

টু্যরিস্ট গাইড অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুল ইসলাম বুলু বলেন, বিদেশি পর্যটক দেশে এলে টু্যরিস্ট গাইডরা বিমানবন্দরে তাদের অভ্যর্থনা জানান। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের গাইড দেশে নেই। ভালো গাইড তৈরি করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং উল্লিখিত সমস্যা কাটিয়ে উঠতে একটি সমল্প্বিত পর্যটন আইনের বিকল্প নেই।

এদিকে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই দেশের পর্যটন শিল্প এবং সেবার মান উম্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশের লক্ষ্যে পর্যটন বোর্ড আইন প্রণীত হয়। সে আইনের বাস্তবায়ন নেই অনেক ক্ষেত্রে। বোর্ডের কার্যাবলির ১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘পর্যটন-সংক্রান্ত ডাটাবেজ তৈরি।’ অথচ দেশে পর্যটন-সংশ্নিষ্ট সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে বিটিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখাসহ সংশ্নিষ্টদের নিয়ে পর্যটন মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। তারা পরিসংখ্যান তৈরির বিষয়ে কাজ করছেন।

নীতিমালা ছাড়া চলছে রিসোর্ট :দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন থাকলেও পর্যটন রিসোর্ট পরিচালনায় আইন নেই। রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ট্রিয়াব) সভাপতি খবির উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, রিসোর্টগুলো পরিচালিত হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে। নীতিমালা হলে সরকার আরও বেশি রাজস্ব পাবে। সম্প্রতি টু্যরিজম রিসোর্ট আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান খান কবির বলেন, টু্যর অপারেটররা শুধু সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন, এক্ষেত্রে আলাদা কোনো আইন বা নীতিমালা নেই। তাই আইনের প্রয়োজন আছে।

বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীর বক্তব্য :বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সমকালকে বলেন, মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো পর্যটন শিল্প-সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যটন নীতিমালা ঘোষণা করে। সরকার পর্যটন নীতিমালার আলোকে এ শিল্পের অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে। এখনই আইন প্রণয়ন না করলেও এটি তাদের সুবিবেচনায় রয়েছে।

পর্যটন দিবসের কর্মসূচি :বিটিবি সূত্র জানায়, পর্যটন দিবস উপলক্ষে আগামীকাল সকাল সাড়ে ৮টায় বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পর্যন্ত শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বেলা ১১টায় টিএসসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে টু্যরিজম ফেস্ট আয়োজন করেছে এভিয়েশন অ্যান্ড টু্যরিজম জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ-এটিজেএফবি। উৎসব উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক রীতা নাহার জানান, সকাল থেকেই উৎসবস্থলে পর্যটন-সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করবে। বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেবেন বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

আরও পড়ুনঃ   খালেদা জিয়াকে কারাগারে বিশেষ বন্দীর মর্যাদা (ডিভিশন) দেওয়া হয়েছে

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 1 =