পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল এখন দেশের উত্তরের হিমালয়কন্যা খ্যাত পঞ্চগড়। এ জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি তেঁতুলিয়া। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এ দুটি স্থান সবার কাছে ব্যাপক পরিচিত। প্রতিবছর টেকনাফের জিরোপয়েন্ট আর তেঁতুলিয়া জিরোপয়েন্ট দেখতে ভ্রমণ করে হাজার হাজার পর্যটক। দেশের এ দুই সীমান্ত ভ্রমণ করলেই অর্ধেক বাংলাদেশ ভ্রমণ হয়ে যায় এমনটি বদ্ধমূল বিশ্বাস ভ্রমণ পিপাসুদের।
দক্ষিণে টেকনাফে চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে সমৃদ্ধ করেছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবনের দর্শনীয় স্থানগুলো। তেমনি উত্তরের তেঁতুলিয়ার নিবির শান্ত প্রকৃতির বুকে অবস্থান নিয়েই অতি কাছ থেকে দর্শন মিলে আকাশচুম্বী হিমালয় পর্বত, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর ভারতের বাণিজ্যনগরী দার্জিলিং।
এ উপজেলাতেই রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার দেশের অন্যতম বৃহত্তর স্থলবন্দর। বন্দরে ইমিগ্রেশন সুবিধা থাকায় অল্প সময়ে ভ্রমণ করা যায় ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের মতো দেশগুলো। ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি চার দেশের নানাশ্রেণীর পর্যটকদের আসা-যাওয়ার সুযোগ থাকায় পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া এখানকার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভৌগলিক অবস্থানের চমকপ্রদ ইতিহাস, পাথর ও চা শিল্প এবং জেলার প্রতœততœনগরী, মহারাজা দিঘী, রক্স মিউজিয়াম, বার আউলিয়া মাজার, শাহী মসজিদ, গোলকধাম মন্দির ও নদ-নদীসহ নানান দর্শনীয় স্থান ঘিরে সমৃদ্ধ করেছে পর্যটন অঞ্চল হিসেবে।
কিন্তু আবাসিক হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিনোদনের পার্ক এর অভাবে বিকশিত হচ্ছে না সম্ভাবনাময়ী এ পর্যটন এলাকাটি। হেমন্ত ও শীত ঋতুতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা-দার্জিলিং আর জিরোপয়েন্ট দেখতে ছুটে আসে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক। এসব অতিথি পর্যটকরা দর্শনীয় স্থানসহ চোখ জুড়িয়ে হিমালয় পর্বত, জিরোপয়েন্ট উপভোগ করতে এসে বিড়ম্বনায় পড়েন আবাসিক হোটেলের অভাবে। থাকার কষ্টই বড় দুর্ভোগ মনে হয় তাদের। বাধ্য হয়েই ছুটে যেতে হয় জেলা শহরে কোন আবাসিক হোটেলে।
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকলেও এখানে তেমন আবাসিক হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট তৈরি হয়নি। আরডিআরএস বাংলো, পাবলিক হেলথ বাংলো, ফ্যাসিলিটিটর ডিপার্টমেন্ট বাংলো থাকলেও এগুলো খুব কম খালি থাকে। এসব বাংলোগুলোতে সব সময় সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনের নামেই বেশির ভাগ আগে থেকেই বুকিং থাকে। ডাকবাংলো ও পিকনিক কর্নারে রাত যাপনের জন্য পর্যাপ্ত কোনো কক্ষও নেই। দুটি বাংলোয় বিশ জন পর্যটক রাত যাপন করতে পারেন। কিন্তু সরকারি ভিআইপি কোনো অনুষ্ঠান থাকলে সেগুলো পর্যটকরা পায় না। যার ফলে এখানে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের আবাসন সংকট থাকায় পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বিনোদনের একমাত্র স্থান হিসেবে রয়েছে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো। প্রায় ৩শ’ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গাছপালা কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এ স্থান। রয়েছে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য। শরৎ হেমন্ত ও শীতকালে এখান থেকেই দেখা মেলে হিমালয় পর্বত চূড়া, কাঞ্চনজঙ্ঘা ও দার্জিলিংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য। টিলার উপর দাঁড়িয়ে দেখা যাবে বিশ কিলোমিটার জুড়ে মহানন্দা নদীতে দলবাঁধা হাজার হাজার পাথর শ্রমিকের নদীতে পাথর তোলার কর্মব্যস্ততা। বিশ্বখ্যাত অর্গানিক চা এখন পঞ্চগড়ে। বি¯তৃত এলাকা জুড়ে তিনশ’র বেশি বড় এবং ক্ষুদ্র চা বাগান। পাথর ও চা শিল্পে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটালেও অবকাঠামোর অভাবে বিকশিত হচ্ছে না পর্যটন শিল্প।
অন্যদিকে মানচিত্রের সবার উপরে তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা। দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর এখানে। প্রায় ১০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এ বন্দরে এখন বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জিরোপয়েন্ট দেখতে ভিড় করেন পর্যটকরা। কিন্তু বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট গতি না থাকায় পর্যটকসহ বন্দরের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাই মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট গতি সরবরাহ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমন উন্নয়ন ঘটবে তেমনি পর্যটকদেরও ভ্রমণ আনন্দও উপভোগ্য হয়ে উঠবে।
কারণ এ স্থলবন্দরের সাথে জড়িয়ে রয়েছে অপার পর্যটন শিল্প। এ স্থান হতে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬১ কিলোমিটার, এভারেস্ট শৃঙ্গ ৭৫ কিলোমিটার, ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, চীন ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিং ৫৪ কিলোমিটার ও শিলিগুড়ি ৮ কিলোমিটার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন কার্যক্রমও চলছে। এ চেকপোস্ট ব্যবহার করে সহজেই পর্যটকরা ভারত, নেপাল আর ভুটান ঘুরতে যাচ্ছেন।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চালুর পর দেশি ও বিদেশি পর্যটকরা এ রুটে ভারতের দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়িসহ নেপাল, ভুটান ও চীনে ভ্রমণে যান। সম্প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তেঁতুলিয়া উপজেলায় জাতীয় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন ম্যুরাল ভাস্কর্য। কিন্তু পর্যটন শিল্পাঞ্চল করতে চাইলে পর্যটকদের থাকার জন্য ভালো মানের আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন রিসোর্ট তৈরি করতে পারলে বদলে যাবে পূর্ণতা পাবে উত্তরের এ পর্যটন শিল্প অঞ্চলটি।
এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শাহীন জানান, পর্যটকদের জন্য তেঁতুলিয়ায় আবাসিক সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের অধীনে সরকারি দুটি বাংলো থাকলেও সরকারি কোনো অনুষ্ঠানের কারণে সেগুলো বরাদ্দ পাওয়া যায় না। বেসরকারিভাবে পর্যটকদের জন্য মানসম্মত কোনো আবাসিকও গড়ে ওঠেনি এখানে। এ জন্য সরকারিভাবে পর্যটন হোটেল নির্মাণ করা হলে এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকরা যেমন থাকার সুবিধা পাবেন তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস জানান, ব্যক্তি বা সরকারি কোন করপোরেশন এগিয়ে না এলে এখানকার আবাসন সমস্যা দূর হবে না। এ ছাড়া যদি বড় কোন ব্যবসায়ী এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন তাহলে এ অঞ্চলের আবাসন সমস্যা সমাধানসহ পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে।

আরও পড়ুনঃ   কোচিংয়ে সঙ্গীতশিল্পী কণার প্রিয় টিচার ছিলেন মোশররফ করিম!

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 5 =