সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বিপরীতমুখী দাবি ও অভিযোগের মধ্য দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ২০ বছর অতিক্রম করেছে। আজ ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি ২১ বছরে পদার্পণ করল। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জেএসএসের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়িদের সঙ্গে মধ্য-সত্তর দশক থেকে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল।

কিন্তু গত ২০ বছরের ইতিহাস সেই যুদ্ধাবস্থার চেয়ে কম তিক্ততায় পরিপূর্ণ নয়। এই সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তার ভিত্তিতে সরকার দাবি করছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে আরও কয়েকটি। বাকিগুলোও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন আছে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা।

তবে জেএসএস সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা গত বুধবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ, ১৫টি আংশিক ও ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান আছে বলে মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। আসলে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি বলেন, চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় জুম্ম জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটিও বলেছে, গত ২০ বছরে চুক্তির ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে তার মধ্যে মৌলিক একটি ধারাও বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের চেয়ে লঙ্ঘন ও ওয়াদা বরখেলাপ করেছে অনেক বেশি।

জেএসএসের সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। তবে তাঁরা সরকারের ওপর চাপ রাখবেন। চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে ‘বৃহত্তর আন্দোলন’-এর ঘোষণা দেবেন।

জেএসএস-এর সূত্র বলছে, পার্বত্য চুক্তি সইয়ের পরবর্তী তিন বছর আট মাসের মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর মধ্যে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থাপন, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে টাস্কফোর্স গঠন, সেনাবাহিনীর ৬৬টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু এর পাশাপাশি পুনর্বাসিত (সেটেলার) বাঙালিদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে বিবেচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রামেই তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিন সার্কেল প্রধানের (রাজা) পাশাপাশি জেলা প্রশাসকেরা স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র দিতে পারবেন বলে আদেশ জারি করা হয়। চুক্তির সঙ্গে বিরোধাত্মক অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন করা হয়। ‘অপারেশন উত্তরণ’ জারি করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সব ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

জেএসএস আরও দাবি করছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি সইয়ের পর তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপন, সংরক্ষিত বনের এলাকা সম্প্রসারণ, বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনে আদিবাসীদের ভূমি দখল, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন প্রণয়ন এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে মনোনীত সদস্য সংখ্যা বাড়াতে আইন সংশোধন করেছে। চুক্তিবিরোধী এ সব সিদ্ধান্ত সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গেই নিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় চলছে দ্বৈতশাসন ও সমন্বয়হীনতা। আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন জেলা পরিষদ এক আইনের অধীনে চলে। অন্যদিকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ চলে আরেক আইনের অধীনে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন হয় না প্রায় ২৮ বছর। সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের কয়েকজনকে দিয়ে চলছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রায় ১৯ বছর আগে হলেও এখনো বিধিমালা প্রণীত হয়নি। ফলে এই সংস্থাটিও কার্যত অকার্যকর।

জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের যে দাবি করছে তা চুক্তির মূল ধারণার (কনসেপ্ট) সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ, একটি মৌলিক বিষয়ও বাস্তবায়ন না করে এই দাবি করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এখনো বাস্তবায়নের চেয়ে অনেক অনেক দূরে আছে।

এ অবস্থায় চুক্তি স্বাক্ষরকারী জেএসএস ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব কমছে না। ২০১৪ সালের নভেম্বরে অসহযোগ আন্দোলন ও ২০১৫ সালের নভেম্বরে ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন জেএসসের প্রধান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। এবারও বৃহত্তর আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 + two =