শাহজাহান আকন্দ শুভ: জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদ, সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানসহ ৮ নেতাকে সোমবার রাতে উত্তরার একটি বাড়িতে গোপন বৈঠক করার প্রাক্কালে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। রাজধানীর কদমতলী থানার নাশকতার দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে ১০ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।আটককৃত নেতাদের কাছ থেকে ৩৫ পৃষ্ঠার একটি চিঠি জব্দ করা হয়েছে। ওই চিঠির সূত্রে এবং গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তাদের কৌশলসহ আরও নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ৮ জামায়াত নেতাকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে-পরে অবরোধকালে দেশজুড়ে যে নাশকতা হয়েছিল সে ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জামায়াত।

সোমবার রাতে গ্রেপ্তার জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মধ্যে আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল ছাড়াও রয়েছেন নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আমির মো. শাহজাহান, সেক্রেটারি জেনারেল নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমির জাফর সাদেক, মো. নজরুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম। আর চট্টগ্রামে গতকাল লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ দলটির ১০ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় জামায়াত, শিবির, বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদল নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে এখন শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। নেই রাজপথের আন্দোলন, জ্বালাও-পোড়াও। নেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বড় কোনো সভা, সমাবেশ বা কর্মসূচি। এ অবস্থার মধ্যে এসব গ্রেপ্তার অভিযান থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সরকারের হঠাৎ হার্ডলাইনে যাওয়ার বিষয়টি।জামায়াত সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম জামায়াতের নেতা ও সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী গত ৩ অক্টোবর দলটির আমির মকবুল আহমাদের কাছে ৩৫ পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠান। যে চিঠিতে চট্টগ্রাম জামায়াতের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয় উল্লেখ করে তা মিটিয়ে ফেলার বিষয়ে ভূমিকা গ্রহণ করতে দলের আমিরকে অনুরোধ জানানো হয়। এ ছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে নতুন কর্মসূচি দিতেও অনুরোধ জানানো হয়। ওই চিঠি হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সোমবার রাতে উত্তরার একটি বাসায় বৈঠক শুরু করেন জামায়াতের আমির, সেক্রেটারি জেনারেলসহ অন্য নেতারা। এ সময় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।পুলিশ বলছে, জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি কী করবে এবং সরকারকে কীভাবে বেকায়দায় ফেলা যায়Ñ এসবের নীলনকশা করতেই ওই গোপন বৈঠক ডাকা হয়েছিল। সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র কৌশল নিয়েও আলোচনা হচ্ছিল। সোমবার রাতে ওই বৈঠক থেকে জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডস্থ গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে। সেখানে শুরু হয় উত্তরার গোপন বৈঠকের বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ। জিজ্ঞাবাদে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করছে পুলিশ।গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি নর্থ শেখ নাজমুল আলম  বলেছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জামায়াত নেতাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে এখন অধিকতর অনুসন্ধান ও তদন্ত চলছে।আগামীকাল জামায়াতের হরতালজামায়াতের আমির, সেক্রেটারি জেনারেলসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আগামীকাল বৃহস্পতিবার হরতাল ঘোষণা করেছে দলটি। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয় দলটির পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত আমির এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুমকে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।জামায়াতের পাঠানো বিবৃতিতে আরো বলা হয়, নেতাদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে ‘সাজানো মিথ্যা’ মামলা দিয়ে প্রত্যেককে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে এবং তাদের মুক্তির দাবিতে আজ বুধবার সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পালন করবে দলটি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা শান্তিপূর্ণ হরতাল এবং ১৩ অক্টোবর শুক্রবার গ্রেপ্তারকৃত নেতৃবৃন্দের মুক্তির জন্য দেশব্যাপী দোয়া কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সকল বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করে দেশকে একদলীয় শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে গত ৯ অক্টোবর রাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে।জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদসহ ৮ নেতাকে কদমতলী থানার দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল বিকালে ঢাকা মহানগর হাকিম গোলাম নবীর আদালতে হাজির করা হয়। মামলা দুটির তদন্ত কর্মকর্তা কদমতলী থানার ইন্সপেক্টর মো. সাজু মিয়া প্রত্যেক মামলায় আসামিদের ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কদমতলী থানাধীন বিক্রমপুর গার্ডেন সিটির ৪৪২/২ পূর্ব ধোলাইপাড়ের বাসার ৭ তলায় আসামিরা গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ উপস্থিত হলে অপর ১০ জন আসামি গ্রেপ্তার হলেও উক্ত আসামিরা পালিয়ে যায়। আসামিরা গোপনে মিলিত হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধনসহ দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি, অন্তর্ঘাতমূলক কার্যসম্পাদন ও জ্বালাও-পোড়াও পরিস্থিতি সৃষ্টির পরিকল্পনার জন্য একত্রিত হয়েছিল। তাই আসামিদের সঙ্গে আর কে কে উপস্থিত ছিল তা জানার জন্য এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।আসামি পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম কামালউদ্দিন, আবদুর রাজ্জাক, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম, সানাউল্লাহ মিয়া প্রমুখ রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিন আবেদনের শুনানি করেন।রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আমিনউদ্দিন মানিক ও সালমা হাই টুনি জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন।শুনানি শেষে বিচারক আসামিদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলায় ৫ দিন এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের অপর মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।এর আগে একই মামলায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ ১০ জনের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। ওই আসামিদের গ্রেপ্তারের সময় ককটেল, জিহাদি বই, ২টি বড় ছুরি ও ৩টি চাপাতি উদ্ধার করে পুলিশ।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 − six =