আসামিরা সব ‘প্রভাবশালী’। ক্ষমতার দাপটে তাঁরা পার পেয়ে যেতে পারেন—শুরু থেকেই এই আশঙ্কা ছিল ছেলে হারানো মা জাহেদা আমিন চৌধুরীর। এ কারণে ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের কাছে ধরনা দেওয়া এবং খোলা চিঠি লেখা—সবই করেছেন তিনি। গত এক বছর এভাবেই কেটেছে তাঁর। আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য বারবার আকুতি জানান তিনি। কিন্তু কিছুই হয়নি। তাঁর ছেলে দিয়াজ ইরফান চৌধুরী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক ছিলেন।

ছেলে হত্যার বিচারের কোনো আশা দেখতে না পেয়ে প্রতিবাদী এই মা শেষ পর্যন্ত আমরণ অনশনের পথ বেছে নেন। অসুস্থ অবস্থায় গত সোমবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বঙ্গবন্ধু চত্বরে অনশন শুরু করেন। দুপুরে ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে অবস্থান নেন। সেদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম শহরের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু কিছুতেই অনশন ভঙ্গ করেননি তিনি। স্বজন ও চিকিৎসকেরা নানাভাবে চেষ্টা করেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত তাঁকে কিছু খাওয়াতে পারেননি। চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের তিনি শুধু একটি কথাই বলেছেন, তাঁর ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত কিছুই খাবেন না।

নিজে চাকরি করে বহু কষ্টে সন্তানদের মানুষ করেছেন মা জাহেদা আমিন। ছেলের লাশ যেদিন ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ, সেদিন থেকেই তিনি বলে আসছেন, এটি হত্যাকাণ্ড। ময়নাতদন্তে মায়ের সেই বিশ্বাসের প্রমাণ মেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী জাহেদা আমিন চৌধুরীর বাসা ক্যাম্পাসের ২ নম্বর গেট এলাকায়। গত বছরের ২০ নভেম্বর এই বাসা থেকে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেদিন বাসায় দিয়াজ ছাড়া পরিবারের আর কেউ ছিলেন না। ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এই অভিযোগ এনে গত বছরের ২৪ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপু (বর্তমানে স্থগিত কমিটি), সাবেক সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন চৌধুরীসহ ১০ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যাওয়ার আগে দিয়াজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

অনশনের পঞ্চম দিনে গতকাল দুপুরে তিনি চট্টগ্রাম শহরের নিজ বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান পরিবারের সদস্যরা। গতকাল বেলা তিনটায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শয্যায় ঘুমিয়ে আছেন জাহেদা আমিন। আরেকটি বিছানায় উৎকণ্ঠা নিয়ে অবস্থান করছিলেন তাঁর দুই মেয়ে। ছিলেন বড় মেয়ের স্বামী ও ছেলে। একপর্যায়ে ঘুম ভেঙে তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি চলে যাব। দিয়াজের কাছে চলে যাব।’ এরপর আবার ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসকেরা বলেন, তিনি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। নলের মাধ্যমে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এখন স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে তাঁকে।

দিয়াজের মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্ত হয় গত বছরের ২১ নভেম্বর। ২৩ নভেম্বর পুলিশ জানায়, দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে—এমন আলামত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মেলেনি। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দিয়াজের পরিবারসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি অংশ। পরে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর দিয়াজের লাশ কবর থেকে তুলে পুনরায় ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ১১ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে লাশের দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দিয়াজকে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে।

দিয়াজ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী ছিলেন। হত্যা মামলার আসামিদের অধিকাংশই নাছিরের অনুসারী।

হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করেন দিয়াজের বড় বোন জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভাইয়ের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছেন তাঁরা। সবাই আশ্বাস দিলেও আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, আসামিরা এক রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় আছেন। এ জন্য তাঁরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর সাহস পাচ্ছেন। একই কারণে পুলিশও তাঁদের গ্রেপ্তার করছে না।

সুত্রঃ প্রথম আল

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × four =