তিনি তান্ত্রিক সাধকদের গডফাদার। নাম রমেন হাওলাদার ওরফে শান্ত কবিরাজ। তার ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার তান্ত্রিক চিকিৎসা ও তদবিরের নামে প্রতারণা বাণিজ্য। ঢাকার মৌচাক, কাজীপাড়া, শাহ আলী থানা এলাকার বাইরে গাজীপুর, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ ও চিটাগাং রোডে এমন বাণিজ্য চালিয়ে
যাচ্ছেন রমেনের নিয়োজিত একাধিক ভাড়াটে সাধক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের ১ নম্বর রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে রাধিকা কবিরাজ নামে ব্যবসা চালাচ্ছে রমেনের কথিত স্ত্রী রাধিকা কবিরাজ। যদিও রাধিকার আসল নাম অঞ্জনা।

রমেনের বড় ভাই রণজিৎ কবিরাজ নামে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে আশুলিয়া এলাকায়। গাজীপুরের ব্যবসা চালাচ্ছে নিখিল ওরফে স্বপন শক্তি কবিরাজ। চিটাগাং রোড ও মৌচাকের আস্তানায় একটি খুন ও বড় ধরনের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় সম্প্রতি আস্তানা গুটিয়ে নিয়েছে আরো দু’জন ভণ্ড কবিরাজ।
স্বামী-স্ত্রীর অমিল, মনের মানুষকে কাছে পাওয়া, শত্রু দমন, বিবাহবন্ধন দূর করা, ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি, শত চেষ্টায়ও লেখাপড়ায় মন না বসা, জীনে ধরা দূর করা, বান জাদুটোনা থেকে মুক্তি পাওয়া, জমি জায়গা থেকে ঝামেলা- এরকম নানা বিষয়ে তদবির করেন রমেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা কবিরাজরা। তারা সবাই চ্যালেঞ্জ ছোড়েন, আগে কাজ পরে টাকা। নানা সমস্যায় পড়ে চোখে অন্ধকার দেখা নারী-পুরুষ প্রতারক কবিরাজদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ভিড় জমান।
শনিবার দুপুরে সরজমিনে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের ১ নম্বর রোডে গিয়ে ফোন দেয়া হয় রাধিকা কবিরাজকে। ৫ মিনিটের মধ্যে তার এক তরুণ কর্মী ইশারায় ডেকে নিয়ে যান রাধিকার ঘরে। ঘরের দেয়ালের প্রায় পুরোটাই সনাতন ধর্মের বেশ কয়েকজন দেব-দেবীর ছবি দিয়ে ঢাকা। আলাপের শুরুতে তদবির দেয়ার জন্য ২০১ টাকা দাবি করেন রাধিকা। পরে এ প্রতিবেদক নানা কথার ফাঁকে ‘আরেক দিন আসবেন’ বলে বেরিয়ে আসেন রাধিকার আস্তানা থেকে।
পরে রাধিকার কাছের এক সহযোগী জানান, আসলে রাধিকা দিদি ‘শো’ মাত্র। সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ রমেনের হাতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাধিকার ওই সহযোগী আরো জানান, বিত্তশালী পুরুষ বা মহিলা গেলে বা সুন্দরী কোনো তরুণী গেলে নিজেই তদবির দেন রমেন। আর এসব ক্ষেত্রে বিত্তশালীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। তরুণীকে তদবির দেয়ার শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে রমেন প্রায়ই তরুণীদের বাধ্য করেন তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে। তদবিরে কাজ হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সবই ভুয়া। মানুষকে যেসব তদবির দেয়া হয় তার মধ্যে তাবিজই বেশি। কাঁচা হলুদ, মরিচের গুঁড়া, লবণ একত্রে ভরে তাবিজ দেয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে তাবিজে ভরা হয় ভোজ পাতা, মিলনলতা।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি সনিয়া ছদ্মনামের এক তরুণী তার ভালোবাসার মানুষকে নিজের বশে আনতে শরণ্নাপন্ন হন রাধিকা কবিরাজের। তরুণী বেশ সুন্দরী হওয়ায় নজরে পড়েন রমেনের। রাধিকার কাছ থেকে তরুণী সনিয়ার সব তথ্য জেনে নিজের কক্ষে ডেকে নেন তাকে। বলেন, জাদুটোনার কাজ আসলে কুফরি-কালামের কাজ। তুমি-আমি একসঙ্গে অপবিত্র না হলে তদবির কাজ করবে না। তাছাড়া, তদবিরে ভালো ফল পেতে লাগবে বাঘের চামড়া। এটা সংগ্রহ করা কঠিন। সহজ পথ হচ্ছে, দু’জনের ফিজিক্যাল রিলেশন। রিলেশন শেষে বীর্য সংগ্রহ করে তা দিয়ে তাবিজ করলে তোমার মনের মানুষ তোমার হাতে ধরা দেবে।
এ বিষয়ে সনিয়া মানবজমিনকে বলেন, রমেন ও তার সাঙ্গপাঙ্গ সবাই ভণ্ড। কোনো মেয়ে তদবিরের জন্য রাধিকার কাছে গেলে কৌশলে সে তাকে নিজের রোগী করে নেয়। তারপর অর্থের পাশাপাশি নানা ছুঁতোয় বাধ্য করে শারীরিক সম্পর্ক করতে। তিনি বলেন, আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে বশে আনতে রাধিকার কাছে গিয়ে রমেনের খপ্পড়ে পড়ি। সে আমার কাছ থেকে নগদ ছয় হাজার টাকার পাশাপাশি সম্ভ্রম লুটে নিয়েছে।
রুবি ছদ্মনামের আরেক তরুণীও প্রায় একই অভিযোগ করে বলেন, আসলে রমেন ও তার সহযোগীরা মানুষের সরলতার সুযোগ নিচ্ছে। মানুষ বড় ধরনের সংকটে পড়লে পরগাছায়ও আস্থা রাখার মতো মানসিক অবস্থায় পৌঁছে যায়। এরকম দুর্বল মুহূর্তে রমেন-রাধিকারা মানুষের চরম ক্ষতি করে।
সূত্র জানায়, সুজন নামের এক তরুণ সম্প্রতি বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে কাছে পাওয়ার তদবির নিতে যায় রাধিকার কাছে। যত অর্থ খরচ হোক- তা খরচ করতে রাজি ছিলেন সুজন। সুজনের এমন বক্তব্যে সামনে চলে আসে রমেন। সে সুজনকে জানায়, একটা সম্পর্ক ভেঙে কাউকে নিজের কব্জায় আনতে বেশি খরচ লাগবে। তদবিরের জন্য সুজনের কাছে ৮০ হাজার টাকা দাবি করেন রমেন। পরে দু’পক্ষের রফা হয় ৬০ হাজার টাকায়। তিন দিনের মধ্যে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে তদবির নিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি সুজন। এ বিষয়ে সুজন মানবজমিনকে বলেন, আসলে আমি ঠেকে শিখলাম। তন্ত্র-মন্ত্র-সাধনা সবই প্রতারণা। আসলে আমার মতো বোকারাই এসবে বিশ্বাস করে। ৬০ হাজার টাকা ফেরত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সুজন বলেন, তদবিরে কাজ না হওয়ায় গত ২০শে নভেম্বর রমেন আমাকে ২০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছে। মঙ্গলবার বাকি টাকা ফেরত দেয়ার কথা। আমি অপেক্ষা করছি।
সিলেটের এক টেইলার্সে মাস্টারের কাজ করেন নাজির। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এক মেয়েকে ভালোবাসতাম। মেয়েটি আমাকে পাত্তা দিতো না। ঢাকায় গিয়ে রাধিকা কবিরাজের সন্ধান পেয়ে গেলাম তার আস্তানায়। তাকে তদবির নেয়ার অংশ হিসেবে অনেক শাড়ি দিলাম, ক্যাশ ২০ হাজার টাকাও দিলাম। কোনো ফল পেলাম না। অথচ, তদবির দেয়ার আগে আমাকে দিয়ে এক বোতল পানি আনিয়ে তাতে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল ভণ্ড কবিরাজ রাধিকা। তা দেখে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাধিকার চাওয়া মতো শাড়ি দিলাম, অর্থ দিয়ে তদবির নিলাম। এত কিছু করেও আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে পেলাম না। আমার ভালোবাসা এখন ঘর করছে অন্যের।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

20 − one =