আফসানা সুমী:

বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। ভ্রমণ, চিকিৎসা বা ব্যবসায়িক কাজে বা পড়াশোনার প্রয়োজনে একাধিকবার ভারত যেতে হয় এমন অনেক বাংলাদেশিই আছেন। আবার অনেকে হয়ত এই প্রথমবার ভারত যাচ্ছেন। সবার জন্যই প্রয়োজন বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতের বিস্তাড়িত তথ্য। কি কি উপায়ে যাওয়া যায়, কত খরচ, কোন সময়ে যাত্রা শুরু করা দরকার এই সব তথ্য একসাথে জড়ো করার চেষ্টা করছে প্রিয়.কম।

প্রথমেই চলুন জেনে নিই রেলপথ সম্পর্কে। একে একে জানব বাসের সকল তথ্য এওবং যেসব পথে বাস, ট্রেন কিছুই যায় না সেসব পথেও কি করে যাওয়া যায় সেই ব্যাপারে। ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেনে আপনি শুধু ভারতের কলকাতা যেতে পারবেন। আপনার স্থলবন্দর হবে হরিদাসপুর/গেদে। ট্রেনের নামটি ভারত গেছেন অথবা যেতে চান এমন সবাই জানেন। তার নাম ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’। বিস্তাড়িত-

মৈত্রী এক্সপ্রেসঃ 

ঢাকা-কলকাতা সংযোগ স্থাপনকারী মৈত্রীর মোট ট্রেন ৪টি। বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন দুইটির নম্বর-

ঢাকা-কলকাতাঃ ৩১০৭

কলকাতা-ঢাকাঃ ৩১০৮

ভারত রেলওয়ের ট্রেন দুইটির নম্বর-

কলকাতা-ঢাকাঃ ৩১০৯

ঢাকা-কলকাতাঃ ৩১১০

কোন ট্রেন কি বার ছাড়ে-

বিআর ৩১০৭ শুক্রবার এবং রবিবার ঢাকা থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে ছাড়বে।

বিআর ৩১০৮ শনিবার এবং সোমবার কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়বে।

আইআর ৩১০৯ শুক্রবার এবং মঙ্গলবার কলকাতা থেকে ঢাকা আসবে।

আইআর ৩১১০ শনিবার এবং বুধবার ঢাকা থেকে কলকাতা যাবে।

সময়সূচী এবং ট্রেন ছাড়ার স্থানঃ

ঢাকা থেকে ট্রেন ছাড়বে সকাল ৮ টা ১০ মিনিটে। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ছাড়ে এই ট্রেন। কলকাতা পৌঁছে সন্ধ্যা ৭টায়। কোনো কারণে দেরি হলে সর্বোচ্চ ৯টা বাজতে পারে।

আবার কলকাতার চিতপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ে সকাল ৭টা ১০ এ। ঢাকায় সেই ট্রেন পৌঁছে সন্ধ্যা ৭টার আগে। এক্ষেত্রেও কোনো কারণে সময় বেশি লাগতে পারে।

ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটার। ট্রেনের গতি ঘন্টায় ৪০-৪২ কিলোমিটার। সেই হিসেবে ১১ ঘন্টা সময় লাগে। তবে মনে রাখতে হবে মাঝে ইমিগ্রেশন আছে। সেখানে কিছু সময় লাগবে। তাই মোট সময়টা ২/১ ঘন্টা এদিক ওদিক হতে পারে।

রিটার্ন টিকিট কাটার নিয়মঃ

ঢাকায় কলকাতা যাওয়ার ট্রেনের টিকিট কেনা যায় একমাত্র কমলাপুর রেলস্টেশনে। আপনি চাইলে এখান থেকে রিটার্ন টিকিট অর্থাৎ ফিরতি পথের টিকিটটিও কিনতে পারবেন। তবে সেক্ষেত্রে আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়! কারণ কলকাতা থেকে ঢাকার ট্রেন টিকিট বাংলাদেশ রেলওয়ে পায় শতকরা ২০ টি। শতকরা ৮০টি টিকিট থাকে কলকাতা কাউন্টারে। এত কম টিকিটের মাঝে নিজের টিকিটটি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার বৈকি।

মৈত্রী এক্সপ্রেসের ভাড়া-

এসি ফার্স্ট কেবিনঃ

২০ ডলার + ১৫ শতাংশ ভ্যাট + ভ্রমণ কর। ডলারের রেট অনুযায়ী এই ভাড়া এদিক সেদিক হয়। ৮০ টাকা রেট ধরলে জনপ্রতি টিকিট মূল্য আসে ১৬০০+২৮০+৫৪০= ২,৩৮০ টাকা।

এসি চেয়ারঃ

১২ ডলার + ১৫ শতাংশ ভ্যাট + ভ্রমণ কর। অর্থাৎ ৯৬০+১৪৪+৫৪০= ১,৬৪৪ টাকা।

শিশুদের বয়স সীমা যদি ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে হয়ে থাকে তাহলে তাদের ক্ষেত্রে ভাড়া ৫০ শতাংশ কম হবে। ৫ বছরের বড় শিশুদের ভাড়া বড়দের সমান। বয়সের প্রমাণ হিসেবে অবশ্যই পাসপোর্টের জন্ম তারিখ বিবেচনা করা হয়।

ভ্রমণ কর আগে ৫০০ টাকা ছিল। গত জুলাই মাস থেকে এই কর ৫৪০ টাকা করা হয়েছে। তবে এটা শুধু বেনাপোল বর্ডারের জন্য প্রযোজ্য।

টিকিট কাটার সময়ঃ

সকাল ৯টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত কমলাপুর রেল স্টেশনে কলকাতা যাওয়ার এবং ফেরার টিকিট নিতে পারবেন।

অগ্রিম টিকিটঃ 

মৈত্রী ট্রেনের টিকিট অগ্রিম কাটা যায়। তবে সর্বোচ্চ ৩০ দিন আগ পর্যন্ত টিকিট কাটতে পারবেন। ৩১ দিন আগে হলেও টিকিট দিবে না। অর্থাৎ ১ মাস আগ পর্যন্ত টিকিট বিক্রির নিয়ম আছে। এর ১ দিন আগে হলেও টিকিট দেওয়া হয় না। আর সর্বনিম্ন ৫ দিন আগে টিকিট কেটে ফেলা উত্তম। নচেৎ টিকিট নাও পেতে পারেন।

মালামালের ওজনঃ

বিমানের মতো ট্রেনেও আপনার মালামালের ওজনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে! একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তি তার সাথে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি পর্যন্ত ওজনের মালামাল নিয়ে যেতে পারবেন। শিশুদের ক্ষেত্রে মালামালের ওজনের সীমা ২০ কেজি পর্যন্ত।

বাড়তি মালামালের চার্জঃ 

ওজনের সীমা অতিক্রম করলে প্রতি কেজিতে আপনাকে দিতে হবে ২ ডলার বাড়তি ফি। তবে সর্বমোট ওজন ৫০ কেজির বেশি হলে প্রতি কেজিতে এই ফি বেড়ে যাবে অনেক গুণ। তখন আপনাকে গুনতে হবে প্রতি কেজিতে ১০ ডলার করে!

সুসংবাদঃ 

১। নভেম্বর ২০১৭ থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সীমান্তের গেদে স্টেশনে না হয়ে হবে চিতপুর স্টেশনে। এতে ট্রেন যাত্রার সময় ৬ ঘন্টা কমে আসবে বলে জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। বাকিটা জানা যাবে ভ্রমণকারীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। প্রিয়.কম থেকে শীঘ্রই আমরা যাত্রীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে আনার চেষ্টা করব।

২। আগামী ৯ নভেম্বর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে মৈত্রী এক্সপ্রেস ২। খুলনা থেকে কলকাতা যাতায়াত করবে এই ট্রেন।আপাতত সপ্তাহে ২ দিন চলবে এই ট্রেন। খুলনা থেকে যাত্রা শুরু করবে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে। যশোর হয়ে কলকাতা পৌঁছবে সন্ধ্যার মাঝেই। ভাড়া এসি কেবিনের জন্য ৮ ডলার ও চেয়ার কারের জন্য ৫ ডলার।

৩। ভবিষ্যতে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে একটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাংলাদেশের সাথে শুধু ভারতের নতুন রেলসংযোগই নয়, সংযোগ তৈরি করবে নেপাল ভুটানের সাথেও। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে কতদূর এগিয়ে চলেছে এই প্রসঙ্গে জানতে প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে কয়েকবার ফোন করেও পাওয়া যায় নি।

বাংলাদেশের স্থলসীমা ঘিরে থাকা ভারতের সাথে আরও অনেক পথেই সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে আমাদের। দেশ বিভাগের আগে নির্মিত অনেক রেললাইন এখন পরিত্যাক্ত যা মেরামত করে আবার চালু করা হলে তা শুধু ভ্রমণের জন্যই সুবিধাজনক হবে না তার সাথে সমৃদ্ধি আনবে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ভারিত গমন করে। শিক্ষা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ তো রয়েছেই। তাই যোগাযোগ আরও উন্নত করার ব্যাপারে উভয় দেশেরই উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একইসাথে ইতিমধ্যে গ্রহণ করা পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া এখন সময়ের দাবি।

সম্পাদনাঃ ড. জিনিয়া রহমান

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

two × 2 =