মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চিকে বিশ্ব মাথায় তুলে রাখলেও রোহিঙ্গা সংকটে নায়ক এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এই ইস্যুতে যে সহমর্মিতা তুলে ধরতে পেরেছেন, তা বিশ্বের অনেক বড় ও ধনী দেশের নেতারা দেখাতে পারেননি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক খ্যাতনামা লেখক, সাংবাদিক ও এশিয়াবিষয়ক ভাষ্যকার এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক সদানন্দা ধুমি এক নিবন্ধে এ মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জনপ্রিয়তম ইংরেজি দৈনিক খালিজ টাইমস শেখ হাসিনাকে ‘প্রাচ্যের নতুন তারকা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক রক্ষণশীল মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে গত মঙ্গলবার ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হ্যাজ আইডিওলাইজড অং সান সু চি, বাট দ্য হিরো অব দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস ইজ শেখ হাসিনা’ শীর্ষক ধুমির নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী নিউজউইক, ওয়ার্ল্ড নিউজ নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন পশ্চিমা গণমাধ্যমেও এই ভারতীয় লেখকের নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়।

নিবন্ধটিতে ধুমি বলেন, ‘এই সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কলামে আমি দুটি প্রতিবেশী দেশের নেতা মিয়ানমারের অং সান সু চি ও বাংলাদেশের শেখ হাসিনার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেছিলাম। শেখ হাসিনার তুলনায় সু চি পশ্চিমা দুনিয়ায় অনেক বেশি পরিচিত হলেও দুই নেতাই তাঁদের জীবনে অভিন্ন কষ্ট ভোগ করেছেন। দুজনই ১৯৪০ সালের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ দশকে জন্ম নিয়েছেন। ওই সময়টাতে উপনিবেশ-উত্তর অনেক এশিয়ান জাতি স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। দুজনের বাবা যথাক্রমে জেনারেল অং সান ও শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁদের নিজ নিজ দেশের জাতির পিতা।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা দুজনকেই হত্যা করে। ’

সামান্য হলেও দুজনের (হাসিনা-সু চি) মধ্যে আরো কিছু মিল আছে। দুই নেতাই তাঁদের জীবনের একটি অংশ কাটিয়েছেন দিল্লিতে। সু চি ষাটের দশকে দিল্লিতে থেকে লেখাপড়া করেছেন এবং হাসিনা দিল্লিতে বসবাস করেন ১৯৭৫ সালের পর, তাঁর বাবা সপরিবারে খুন হওয়ার ঘটনায়।

সদানন্দ ধুমি বলেন, ‘এই দুজনের মধ্যে মৃদুভাষী সু চির প্রচুর গুণমুগ্ধ মানুষ রয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ায়। নিজ দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম করার কারণে ১৯৯১ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে সু চি হয়ে ওঠেন তীব্র বিরোধিতার বিপরীতে এক নীরব সংকল্পের প্রতিমূর্তি। তাঁর চমৎকার ইংরেজি বাচন ও বিশ্বজনীন ভাবমূর্তিতে বাধা পড়েনি। বিপরীত দিকে শেখ হাসিনা নিজে একটি স্বনামধন্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি কখনোই দেশটির ইংরেজি বলা অভিজাত শ্রেণির অংশ হননি। গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সাক্ষাৎকারের পর আমি তাঁর বাবার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি বইয়ে তাঁর অটোগ্রাফ চেয়েছিলাম। তিনি বইটিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলায় তাঁর নাম লিখলেন। কিন্তু যদিও পশ্চিমা ধাঁচের ‘দ্য লেডি অব ইয়াঙ্গুনের’ মতো করে ‘দ্য লেডি অব ঢাকা’-কে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর পরও রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সন্দেহাতীতভাবেই সময় এখন শেখ হাসিনার। নিজের দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে গ্রহণ করে হাসিনা বিশ্বের অনেক বড় ও ধনী দেশের নেতাদের তুলনায় অসামান্য পরদুঃখকাতরতা প্রদর্শন করেছেন। যেমন হাসিনা আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ধনী দেশ না হতে পারে; কিন্তু আমাদের একটি বড় হৃদয় আছে। ’

প্রাচ্যের নতুন তারকা : গতকাল শনিবার আরব আমিরাতের খালিজ টাইমসের কলামিস্ট অ্যালান জ্যাকবের লেখা ‘শেখ হাসিনা নোজ দ্য আর্ট অব কমপ্যাশন’ (শেখ হাসিনা জানেন সহমর্মিতার নৈপুণ্য) শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধের শুরুতেই তিনি শেখ হাসিনাকে নিয়ে এর আগে না লেখার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে এবং সু চির চোখ দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে দেখার জন্য বিশ্ব গণমাধ্যমকে অপরাধী হিসেবে আখ্যা দেন।

বাসস জানায়, অ্যালান জ্যাকব তাঁর কলামে স্বীকার করে বলেন, ‘স্বৈরাচারী, ঘৃণিত গুরু এবং নামগোত্রহীন লোকদের নিয়ে লেখার আগেই আমাদের উচিত ছিল শেখ হাসিনাকে এই পাতায় উপস্থাপন করা। ’ তিনি বলেন, ‘ লেখার বিষয় নির্বাচনের আগে সব সময় আমাকে কোনো বিষয় এবং ব্যক্তিদের ব্যাপারে ভাবতে হয়। এখানে স্বীকার করা উচিত, এ সপ্তাহে আমার লেখার বিষয়ে দক্ষিণ ভারতের একজন অভিনেতা এবং রাজনৈতিক মাঠে তাঁর আশাবাদী কর্মকাণ্ড মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু আমি যখন বুঝতে পারলাম, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হচ্ছেন প্রাচ্যের নতুন তারকা, তখন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলাম। ’

জ্যাকব বলেন, ‘হ্যাঁ, মিয়ানমারে একজন নোবেল বিজয়ীর উজ্জ্বলতা হারানোর বিষয় নিয়ে মিডিয়া অধিক ব্যস্ত থাকায় আমরা এই মহৎ সুযোগটি হারিয়েছি। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক আবেদনটি অবজ্ঞা করায় একটি অপরাধের বোঝা আমাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বলেছেন, এটি (রোহিঙ্গা নির্যাতন) তাঁর হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। ’

জ্যাকব বলেন, বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর মতো নেতারা যখন কর্ণধার হন, তখন অভিবাসন সমস্যা নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত বিশ্বে আশার আলো জ্বলে ওঠে। তাঁর কর্মকাণ্ড প্রথমে ক্ষীণ মনে হয়েছিল, তবে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গা সমস্যা প্রত্যক্ষ করতে খালিজ টাইমস যখন একজন রিপোর্টার পাঠাল, তখনই প্রকৃত সমস্যাটি সামনে চলে আসে।

খালিজ টাইমসের কলামিস্ট বলেন, বিশ্ব গণমাধ্যম রোহিঙ্গা সংকটকে সু চির চোখে দেখার জন্য অপরাধী। দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দ্বারা দেশছাড়া হওয়া রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে সু চিকে অসহায় মনে হয়েছে। তিনি যা করছেন তা হচ্ছে তিনি নির্বাচনে সাফল্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন কিংবা বলা যায়, তিনি ব্যালটের ফায়দা লুটছেন। সু চি এত দিন ধরে যে রাজনৈতিক সংগ্রামটি চালিয়ে এসেছেন তা সামাজিক ও মানবিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তা থেকে তিনি বিচ্যুত হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি নিজে একটি কোটরে আবদ্ধ হয়ে আছেন এবং প্রতীকী নেতায় পরিণত হয়েছেন।

জ্যাকব বলেন, সু চি কণ্ঠস্বর যখন হারিয়েছেন এমন সময় শেখ হাসিনার সোচ্চার হয়ে ওঠা এক বিরাট স্বস্তি। সু চি ও শেখ হাসিনা তাঁদের নিজ নিজ দেশের মুক্তিসংগ্রামের মহানায়কের কন্যা। দুজনেই খুব কাছ থেকে ট্র্যাজেডি দেখেছেন। যদিও ফারাকটা বিশাল। মানবতা যখন বিপন্ন তখন একজন নিছক দর্শক হয়ে থাকার পথ বেছে নিলেন, অন্যজন দেখালেন অমায়িক দয়া। শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ছোট্ট দেশটিতে একবারে ৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন। সূত্রঃ 

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

sixteen − 8 =