মাত্রই দুই বছর আগে বাল্টিমোরের একটি মসজিদের ভিতর ধাতব নির্মিত একটি ফোল্ডিং চেয়ারে বসেছিলাম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের কথা শুনছিলাম। আমার মতো সেখানে উপস্থিত প্রায় ২০০ জন আমেরিকান মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তিনি বলছিলেন, আমরা আমেরিকার অন্তর্গত। মসজিদ প্রবেশের রীতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার জুতো খুলে হেলানো ডেস্কের ওপর দাঁড়িয়ে উপস্থিত লোকজন ও টিভি ক্যামেরা গুলোর দিকে এক নজর চোখ বোলালেন। তারপর তিনি বললেন, ‘আপনারা এই দেশটির উপযুক্ত কিনা তা নিয়ে যদি কখনো চিন্তা করেন, তাহলে আমাকে বলতে দিন-আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে প্রমাণ করেছি যে আমি পারি। আপনারাও এখানে উপযুক্ত। আপনারা আমেরিকার অন্তর্গত এবং আমেরিকার একটি অংশও বটে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা মুসলিম বা আমেরিকান নন। আপনারা মুসলিম এবং আমেরিকান।’ দেশটিতে মুসলিম বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি শক্তিশালী বার্তা। তার এই বক্তব্যে আমি আমার চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আমেরিকার মুসলমান ও আমেরিকায় তাদের অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা দিয়েছেন এবং তা আমাকে ফের কাঁদিয়েছে কিন্তু তা একেবারেই ভিন্ন কারণে। আর এর কারণটি হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুধবার সকালের সময়টা ব্যয় করেন একটি প্রপাগান্ডামূলক ধারাবাহিক মুসলিম বিরোধী ভিডিও তার টু্‌ইটারে পুনরায় শেয়ার করার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প তার ৪৩.৬ মিলিয়ন অনুসারীর নিকট মুসলিমদেরকে চিত্রায়িত করেছেন ‘সহিংস ও বর্বর’ হিসেবে। ভিডিওগুলো শেয়ার করেছিলেন জাইডা ফ্রানসেন নামে একজন ব্রিটিশ নারী। এই নারী ‘ব্রিটেন ফার্স্ট’ নামে যুক্তরাজ্যের চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা। দলটি চরম মুসলিম বিরোধী ও অভিবাসন বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অধিক পরিচিত। হিজাব পরা একজন নারীকে আক্রমণের কারণে জাইডা ফ্রানসেন ২০১৬ সালে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। মুসলিমদেরকে হেয় করা ট্রাম্পের জন্য এটাই প্রথম নয়। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধের প্রস্তাব করেছিলেন এবং আমেরিকার মুসলিমদের জন্য একটি ডাটাবেস তৈরির বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প আমেরিকায় বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করেন। এটি বাস্তবায়নে তার একাধিক প্রচেষ্টাকে মার্কিন ফেডারেল বিচারক কর্তৃক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যাইহোক, বুধবার সকালে ট্রাম্পের এই কর্ম আমাকে বিশেষভাবে আঘাত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান এই প্রেসিডেন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে এবং নির্লজ্জের মতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে নগ্ন ঘৃণা ও উসকানি দিতে তার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। একজন মুসলমান আমেরিকান হিসাবে আমার প্রেসিডেন্ট আমাকে এবং আমার সহযোগী মুসলমানদেরকে সম্ভাব্য নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখছেন এবং হয়ত, নিষ্ঠুর বর্বরতার চেয়েও সামান্য বেশি কিছু হিসেবে দেখছেন। কিন্তু তার চেয়ে আরো খারাপ যে জিনিসটি তা হচ্ছে, এটি অন্যান্য আমেরিকানদের বলছে যে তারা কিভাবে আমাদের দেখবে এবং তা অবিশ্বাস্যভাবে বিপজ্জনক হয়ে ওঠছে। ৯/১১ এর হামলার পরের দিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ওয়াশিংটন ডিসি’র একটি মসজিদে গিয়েছিলেন এবং মুসলিম বিরোধিতার বিরুদ্ধে একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সেদিন তিনি তার ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন যে ‘ইসলাম শান্তির’।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 + eleven =