বিশ্বের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কৌশলগত গুরুত্ব তৈরির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বজায় রাখা উচিত। জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখেই এই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে ‘চেঞ্জিং গ্লোবাল ডাইনামিকস: বাংলাদেশ ফরেন পলিসি’ শিরোনামে এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত দেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) এই সেমিনারের আয়োজন করে। বিসের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মুন্সি ফয়েজ আহমদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে সেমিনারের উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। উদ্বোধনী অধিবেশনে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম আবদুর রহমান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ঢল একটি অস্বস্তির বিষয় হয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ের ঢল দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি করেছে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন সূচনা হবে। আমরা আশা করি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে টেকসইভাবে ফেরার মধ্য দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শত শত বছরের অভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভারত। বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে বাংলাদেশ।

পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ৮ দফা অগ্রাধিকারভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মাহমুদ আলী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার নীতি হচ্ছে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীরতর করা। সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির পর আমরা এ বিষয়ে আরও জোর দিচ্ছি। আঞ্চলিক অন্তর্ভুক্তিকরণ ও বহুমাত্রিক সংযোগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার।’

মাহমুদ আলী বলেন, নিকট-প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে। অর্থনৈতিক স্বার্থে কার্যকর অংশীদারত্বের জন্য বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া সারা বিশ্বে শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত রাখবে।

আরও পড়ুনঃ   প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে বিএফইউজে ও ডিইউজে নেতৃবৃন্দের অভিনন্দন

সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার মোহাম্মদ জমিরের সঞ্চালনায় কর্ম অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহ্‌রিয়ার আলম। তিনি বলেন, টেকসই উপায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকার কাজ করছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর তাঁর প্রবন্ধে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি ভারত ও চীনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার ওপর জোর দেন।

আহসান মনসুর বলেন, ভারত উদীয়মান আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক দিক থেকে ইতিবাচক অগ্রগতির সুযোগ আছে। তবে অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য, পানিবণ্টন ও আসামের মুসলিমদের কারণে সম্পর্ক জটিল হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, রোহিঙ্গা সমস্যার মতো যৌক্তিক সংকটে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি। রোহিঙ্গা সমস্যার সুরাহা না হলে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে উপেক্ষা করলে, আসামের সম্ভাব্য ঢলের কারণে বাংলাদেশ ১০ গুণ বড় সংকটের মুখে পড়বে। তাঁর মতে, এখানে বিভিন্ন দেশের জন্য ব্যাপক বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি না হলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কোনো আকর্ষণ তৈরি করবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিক তাঁর প্রবন্ধে বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন স্তরের মাধ্যমে কাজের অনুমতিপত্র পাওয়ার ফলে অভিবাসনের খরচ বাড়ছে, অনিয়মিত ও বিনা বেতনে নিম্নমানের কাজের পরিবেশে বাংলাদেশের লোকজনকে কাজ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া আছে নানা রকম নির্যাতন, নির্ধারিত সময়ের আগে দেশে ফেরা। এই পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতিতে বিদেশে শ্রমিকদের নিরাপদ কাজ ও মানবাধিকার নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেসব সুযোগ পাওয়া যায়, তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের ভারসাম্যমূলক বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ   লিবিয়ায় অপহরণ চক্রের মূল হোতা বাংলাদেশি

পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক বলেন, ‘শুধু রোহিঙ্গাদের কারণেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের কারণেও আমরা বড় সমস্যার মুখে আছি। তাই সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়—এটি বাস্তবায়নের জন্য আমরা চারটি নীতি অনুসরণ করি। এ চারটি নীতি হচ্ছে প্রয়োগবাদ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা।’

পররাষ্ট্রসচিব জানান, গত দুই বছরে বাংলাদেশ কূটনীতিতে পাঁচটি বিষয়ে জোর দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের সম্প্রসারণ, চীন ও ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন, সামুদ্রিক সহযোগিতা জোরদার, ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং বহুপক্ষীয় স্তরে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া। সবশেষে তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের কূটনীতি নিয়ে আমাদের বিশেষ ভাবনা রয়েছে। আমাদের সামনে রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন ও পানির সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে অভিবাসন ও মানবিক বিষয়।’

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

four + twelve =