পেছনে পড়ে আছে স্বজন হারানোর দুঃসহ বেদনা। সুখের সংসার ধুলোমাটিতে মিশে যাওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রাণে বাঁচতে মিয়ানমার সীমান্তের নাইক্ষ্যংদিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। গতকাল রোববার ওপার থেকে রোহিঙ্গা আনার কাজে যুক্ত মাঝি এবং গতকালই আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অন্তত অর্ধলাখ মানুষ এপারে আসার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। নৌকায় পারাপারের মতো টাকাপয়সা সঙ্গে না থাকায় সেখানে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে তারা। এই যখন পরিস্থিতি, তখনও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে সে দেশের সেনাবাহিনী।

আন্তর্জাতিক মহলের অব্যাহত চাপ সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা এবং তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা থামেনি। গতকালও শাহপরীর দ্বীপ থেকে ধোঁয়া দেখা গেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ত্যাগ না করলে গুলি করে মারা হবে- এ ঘোষণা দিয়ে রাখাইন রাজ্যের গ্রামে মাইকিং করা হচ্ছে বলে জানালেন আগত শরণার্থীরা। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার আগেই বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় রোহিঙ্গাদের গ্রাম পোড়ানো হচ্ছে। ফলে এত দিন মাটিকামড়ে ছিল যে রোহিঙ্গারা, এখন তারাও দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, গতকাল রোববার পর্যন্ত চার লাখ নয় হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

নাইক্ষ্যংদিয়ায় আট দিন কাটিয়ে গতকাল এসে লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া একরাম হোসেন এসব কথা বলেন। এ এলাকা সেন্টমার্টিনের উত্তর-পূর্বে সাত কিলোমিটার দূরে মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত। একরামের বাড়ি মংডুর হাসসুরাতা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে আক্রমণ করে ২৭ আগস্ট শেষ রাতে। শুরুতেই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান বাবা। পরে আর বাবাকে খুঁজে পাননি তারা। এপাড়া-ওপাড়া করে শেষ পর্যন্ত সীমান্তবর্তী এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে জড়ো হন। তার পর আরও ১০ জনের সঙ্গে গত বুধবার ভোরে মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেন। সেখানেও সেনাবাহিনী প্রতিদিন এসে গুলিবর্ষণ করছে, যাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। মিয়ানমার ছাড়তে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে সেনারা। এপার থেকে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে টাকা বিনিময় করে রোববার নাফ নদের মোহনা থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। প্রতিজনের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা করে নৌকা ভাড়া নিয়েছে মাঝিরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নৌকার মাঝি বলেন, নাইক্ষ্যংদিয়া নামে মিয়ানমারের ওই দ্বীপমতো এলাকায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাঁবু টাঙিয়ে অবস্থান করছে। এর মধ্যে তারা গত দু’দিনে দুই শতাধিকের বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে এসেছেন বলে জানালেন। মাঝিদের দাবি, রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে তারা বেশি টাকা নেননি। যে যা দিতে পারছে, তা দিয়েই নদী পার করিয়ে দিচ্ছেন।

ইউটিউবে শনিবার আপলোড করা এক ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার রোহিঙ্গা রাখাইনের পশ্চিমে সমুদ্রতীরে জড়ো হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। তারা কাম্নাকাটি করছে। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে তাদের অবস্থা অত্যন্ত কাহিল বলে মোবাইলে ওই ভিডিও চিত্রধারক জানাচ্ছেন। সমুদ্রতীরে জড়ো হওয়া এই রোহিঙ্গারা নৌকায় বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

লেদা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা শিক্ষকের দায়িত্বে নিয়োজিত পুরনো শরণার্থী মোহাম্মদ কাসেম বলেন, ওপারের নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে প্রতিদিন কিছু রোহিঙ্গা পারাপার হচ্ছে এবং আবারও অপেক্ষমাণদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন। গতকালও সেখান থেকে আসা দুটি পরিবারের ২১ জন লেদায় আত্মীয়দের কাছে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্যবর্তী এলাকা রাশিদং ও বুচিদংয়ে রোহিঙ্গাদের দেড় শতাধিক গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ঘাটে ভিড়েছে একটি নৌকা। রোহিঙ্গাদের ২৬ জনের একটি দল নেমে আসে ওই নৌকা থেকে। তাদেরই একজন বুচিদং টংবাজারের বাসিন্দা আবু ছালাম (৪০)। তিনি জানান, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং তাদের সাহায্যকারী রাখাইন সম্প্রদায়ের উগ্রপন্থি তরুণরা রোহিঙ্গাদের গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ে-জঙ্গলে আশ্রয় নিচ্ছে। তারা সেখানে খাদ্য সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

আবদুস ছালাম জানান, মঙ্গলবার দুপুরে তাদের পাড়া পুড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। এ সময়ে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুরা দিজ্ঞ্বিদিক পালাতে থাকে। পলায়নরত রোহিঙ্গাদের পেছন থেকেও গুলি করেছে সেনাবাহিনী। আবদুস ছালাম জানান, আরও অনেকের সঙ্গে তিনিও আশ্রয় নিয়েছিলেন নিকটস্থ একটি পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে। সেখানে বহুসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইনের সশস্ত্র তরুণ যুবকদের ভয়ে তারা পাহাড়ের দুর্গম পথ ধরে হেঁটে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে সেখানে তাদের জীবন ছিল সংকটাপম্ন।

রাখাইনের পশ্চিম সমুদ্র উপকূল থেকে অনেক রোহিঙ্গা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও শামলাপুর উপকূলে প্রতিদিন এসে ভিড়ছে। এদেরই একজন মো. সলিম (৩৪) রাশিদংয়ের চিন্দিপ্রাং থেকে পালিয়ে এসেছেন। সঙ্গে রয়েছে পরিবারের সাত সদস্য। শনিবার সকালে মনখালী পুরাতন ব্রিজ এলাকায় দেখা হয় এই পরিবারটির সঙ্গে। সলিম জানিয়েছেন, চিন্দিপ্রাং ও তানচিপ্রাং পাশাপাশি দুটি রোহিঙ্গাপাড়ার প্রায় চার হাজার রোহিঙ্গা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। বৃহস্পতিবার সকালে পাড়ায় মাইকিং করে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ত্যাগ করার জন্য। না হলে গুলি করে ও পুড়িয়ে মারা হবে। ভয়ে রোহিঙ্গারা রাতের মধ্যে পালাতে শুরু করে। তিনি বলেন, শুক্রবার সকালে দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল, তাদের পাড়ায় আগুন জ্বলছে।

শরণার্থী হয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের কাছে এখনও সরকারি উদ্যোগে কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। টেকনাফ ও উখিয়াবাসীর দাবি, সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ত্রাণ দেওয়া হোক। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের আবাসন ও চিকিৎসার দায়িত্বও যেন সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়। নয়তো ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়বে শরণার্থীরা। স্থানীয়রা তা থেকে রক্ষা পাবে না।

আবু তাহের, কক্সবাজার ও আবদুর রহমান, টেকনাফ

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

nineteen + 4 =