বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায় এবং আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় রয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থ পাচার বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি পিছিয়ে পড়বে।

ব্যবসায়ীরা চান, বাংলাদেশ আর যেন ২০১৩, ২০১৪ বা ২০১৫ সালের মতো পরিস্থিতিতে ফিরে না যায়। তাঁরা এ–ও বলছেন, হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতা এখন আর কার্যকর কোনো কর্মসূচি নয়। দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর এসব কর্মসূচি প্রত্যাহার করা উচিত।

জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আমরা যেসব সহিংসতা দেখেছি, তা পরে আর হয়নি।’ তিনি বলেন, রাজনীতিবিদেরা মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করেন। সাধারণ মানুষ যে এখন আর হরতাল, নৈরাজ্য চায় না, এটা তারা বুঝতে পেরেছেন। ফলে তাঁদের কর্মসূচির ধরন পাল্টেছে।

সফিউল ইসলাম আরও বলেন, যা কিছুই করা হোক না কেন, সেটা করতে হবে অর্থনীতিকে ক্ষতি না করে, ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল রেখে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) পূরণে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের বিকল্প নেই।

খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে দুই দিন ধরে দেশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশজুড়ে ধরপাকড় চলছে। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য জেলার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তবে রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপি কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবে, তা পরিষ্কার নয়। বিএনপির নেতারা খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করতে দেবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, খালেদা জিয়ার মামলার রায় এবং আগামী নির্বাচন ঘিরে ২০১৮ সালজুড়েই দেশে অনিশ্চিত পরিস্থিতি থাকবে।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সাবেক সভাপতি রূপালী চৌধুরী মনে করেন, অনিশ্চয়তাই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশি ব্যবসায়ীরা সাধারণত দেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কী অবস্থা। এ ক্ষেত্রে অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আরও পড়ুনঃ   প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক বাণিজ্যিক হচ্ছে

সাম্প্রতিককালে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে অস্থির ছিল ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে। ২০১৩ সালজুড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি আন্দোলন করে। এর সঙ্গে ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাতিলের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের হরতাল। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও পরবর্তীকালে দেশে ব্যাপক সহিংসতা হয়। ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি টানা অবরোধের ডাক দেয় বিএনপি, যা ২৮০ দিন চলে। যদিও এই অবরোধের কার্যকারিতা ছিল না।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ২০১৩ সালে হরতাল নিয়ে একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরে। এতে বলা হয়, দেশে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ৩ দিন, ১৯৭১ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ৭ দিন, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রতিবছর ১৭ দিন এবং ১৯৯১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৪৬ দিন করে হরতাল হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনের বছরই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার কমে যায়। দেশে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে নির্বাচন হয়, সে বছর প্রবৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে কম হয়। একই ঘটনা ঘটে ২০০১-০২ ও ২০০৭-০৮ অর্থবছরে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরগুলোর তুলনায় কম হয়।

বিগত অবরোধ-হরতালের সময় রপ্তানিপণ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে হয়েছে। বহু পণ্যবাহী যান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রপ্তানিকারকদের কার্যাদেশ আনতে বিদেশে গিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে সভা করতে হয়েছে। এমনকি বিদেশি ক্রেতাদের ওপর হামলাও হয়েছে। দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি খারাপ ছিল। তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আইন করে হরতাল বন্ধের দাবিও করেছিল। ২০১৩ সালে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাব করে দেখায়, এক দিনের হরতালে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরটি সবার জন্য চ্যালেঞ্জিং। এ বছর পোশাক খাতে নতুন মজুরিকাঠামো আসবে। নির্বাচন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারও রপ্তানি খাতের জন্য খুব ভালো অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি করবেন, তবে আমরা চাই দেশে শান্তি থাকুক।’

আরও পড়ুনঃ   সোনার দাম ভরিতে ৫২ হাজার ছাড়াল

দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সংগঠন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে দাবি আদায় সহজ হয়। কিন্তু সহিংসতার আন্দোলন দিয়ে কোনো দাবি আদায় করা যায় না।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

five − 2 =