মালদ্বীপের উত্তপ্ত রাজনৈতিক সংকট এশিয়ায় ভারতের উচ্চাবিলাসী পররাষ্ট্রনীতির জন্য লিটমাস টেস্ট হিসেবে হাজির হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালদ্বীপ নয়নাভিরাম সৈকতের জন্য বিখ্যাত হলেও, এখন দেশটিতে জারি রয়েছে জরুরী অবস্থা। উদ্ভূত অবস্থায় দেশটির সাবেক এক নেতা নয়াদিল্লি¬কে সৈন্য প্রেরণের অনুরোধ জানিয়েছেন। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতেই বোঝা যেতে পারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও চরমপন্থায় আক্রান্ত এই অঞ্চলে কীভাবে ভারত নিজের নেতৃত্বের জানান দিতে চায়।
নয়াদিল্লি¬-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসেস’-এর প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার রুমেল দাহিয়া লিখেছেন, ‘ভারত যদি এত কাছে অবস্থিত নিজের মৌলিক স্বার্থও রক্ষা করতে না পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তাদাতা হিসেবে দেশটির ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’
২০১৩ সালে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসক আবদুল্ল¬া ইয়ামিন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই মালদ্বীপে ধীরে ধীরে আইনের শাসনের অবনতি হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে পরিস্থিতি তুঙ্গে উঠে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুম, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলি হামিদ সহ বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন।

দ্বীপরাষ্ট্রটিতে গণতন্ত্র সূচনার নেপথ্যে যাকে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেওয়া হয়, দেশটির সেই সাবেক নেতা মোহাম্মদ নাশিদ এই পরিস্থিতিতে ভারতের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি নাশিদ এক টুইটার পোস্টে নয়াদিল্লিকে সেনা পাঠানোর আহবান জানান। তিনি ওয়াশিংটনের প্রতি ইয়ামিন সরকারের সঙ্গে যেকোনো লেনদেন স্থগিত করতে মার্কিন ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়ার আহ্বানও জানান।
দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের মতো মালদ্বীপও ভারতের ওপর নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। ভারত ওই অঞ্চলের সবচেয়ে আধিপত্যশীল রাষ্ট্র। ১৯৮৮ সালে নয়াদিল্লি দেশটিতে এক অভ্যুত্থান নস্যাৎ করতে সেনা পাঠায়। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কট্টরপন্থীদের অনেকে বিশ্বাস করেন, মালদ্বীপের রাজনীতিকে দেখভাল করে রাখা ভারতের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে মালদ্বীপে মোদি সেনা পাঠাবেন কিনা, তা নির্ভর করে বেইজিং ও জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র মতো বহিঃ অনুঘটকের ওপর।
চীন
মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের রেকর্ড খুব সুবিধার নয়। এ নিয়ে তিনি জাতিসংঘ ও ওয়াশিংটনের সমালোচনাও শুনেছেন তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বেইজিং-এর সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করেছেন। এর ফলে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের ওপর মালদ্বীপের যেই নির্ভরশীলতা, তা থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
মহাদেশব্যাপী ছড়ানো ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের আওতায়, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি চীন দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যপকভাবে বিনিয়োগ করছে। মালদ্বীপে একটি সেতু ও বিমানবন্দরের রানওয়ে নির্মানে অর্থ ঢালছে দেশটি। এখন আশঙ্কা বাড়ছে যে, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ ধরে যেসব প্রকল্পে অর্থায়ন করছে চীন, তা শিগগিরই চীনের বর্ধিত রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হবে। গত বছর, জিবুতিতে নিজের প্রথম বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে চীন। পশ্চিমা দেশে উদ্বেগ বাড়ছে যে, চীন হয়তো পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপেও ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে। এ দেশগুলোর কাছেই রয়েছে বিশ্বের বৃহৎ কয়েকটি জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহের রুট।
বেসরকারী মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান স্টাটফর সম্প্রতি লিখেছে, ‘বেইজিং-এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে দেখা যায়, মালদ্বীপ দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর ও বিমান ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব দিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগের পথ সুরক্ষিত রাখতে পারবে চীন।’ কিন্তু মোদির জন্য এমন দৃশ্যকল্প মোটেই আকাঙ্খিত নয়। নিজের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় মোদি চান এশিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে। ভারতের আশঙ্কা হলো, মালদ্বীপে চীনের বিনিয়োগ সামরিক উপস্থিতির পূর্বলক্ষণ। স্টাটফর ব্যাখ্যার সুরে লিখেছে, এ কারণে ভারতের চাওয়া নাশিদের মতো কোনো নেতা ক্ষমতায় থাকুক, যাতে ভারতের স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু মালদ্বীপে সেনা পাঠালে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। স্টাটফর লিখেছে, ‘(সেনা পাঠালে) আকারে ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগকারী কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে নয়াদিল্লির ভাবমূর্তি নিঃসন্দেহে নতুন করে সামনে আসবে। এ ধরণের হস্তক্ষেপের ফলে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্য চীনের পক্ষে চলে যেতে পারে। নেপালে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময় যেই ভারত-বিরোধী মনোভাব কাজ করেছে, তা থেকে কিন্তু চীনই লাভবান হয়েছে।’
আইএস ফ্যাক্টর
মালদ্বীপে ভারতের সামরিক উপস্থিতি দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ধর্মীয় উগ্রপন্থাকেও উস্কে দিতে পারে। বহু দশক ধরে মালদ্বীপ মধ্যপন্থী একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, মালদ্বীপ উগ্র রক্ষণশীল সালাফিবাদের দিকে ঝুঁকেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে মালদ্বীপ থেকেই সবচেয়ে বেশি যোদ্ধা সিরিয়া ও ইরাকের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছে।
নয়াদিলি¬ ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবসার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন এক সাম্প্রতিক প্রবন্ধে লিখেছে, ‘ভারতের যেকোনো ধরণের হস্তক্ষেপকে মালদ্বীপে ইসলামের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে প্রচার করা হতে পারে। ইয়ামিন খুব ভালো করে এটি জানেন। তিনি এমনকি হয়তো চানও যে, ভারত এই ভুল পদক্ষেপ নিক। ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করলে ইসলামের রক্ষক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবেন তিনি।’
(নয়স্কা চন্দ্রন মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনবিসি’র প্রতিবেদক।)

আরও পড়ুনঃ   জাতিসংঘের অবরোধ উপেক্ষা করে উত্তর কোরিয়াকে গোপনে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × two =