পর্যটনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম শর্ত দেশীয় অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (জিডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা। সরকারও চায় পর্যটন খাতকে সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপান্তর করতে। কিন্তু একে আন্তর্জাতিক মানদ-ে নেওয়ার প্রধান শর্তই পূরণ করতে পারছে না। এতে জিডিপি বাড়ানোর স্বপ্ন ধূসরই থাকছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ের মেলবন্ধনের বাংলাদেশের।পর্যটন শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতকে এগিয়ে নিতে চাইলেও মাস্টারপ্লান নেই। অন্য দেশগুলো পরিবহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত অবকাঠামো, পরিবেশ-জলবায়ুসহ সব খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যটন বিকাশের কথা মাথায় রাখে। সমন্বিতভাবে সরকারের সব মন্ত্রণালয় কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে এ খাতের বিকাশে শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয় ও অধিভুক্ত দপ্তরগুলোই কাজ করে। সঠিক কর্মপরিকল্পনা, অর্থাভাবসহ নানা কারণে এর গতিও মন্থর। এতে পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থেকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

পর্যটন করপোরেশন ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডসূত্র জানায়, পর্যটন খাত সরাসরি জিডিপিতে কতটুকু অবদান রাখছে তা জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বমানের পর্যটননির্ভর দেশ হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই।পর্যটনকে অর্থনৈতিকভাবে পরিমাপ করা বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেওয়ার শর্ত পূরণ করতে কাজ করছে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ)। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা (ইউএনডব্লিউটিও) অর্থনৈতিক পারস্পরিক সহায়তা এবং স্ট্যাটিকাল অফিস অব দ্য ইউরোপিয়ান কমিউনিটিস (ইউরোস্ট্যাট) এবং জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বিভাগের ভ্রাতৃপ্রতিম এ সংস্থা পর্যটন অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ করে থাকে। কিন্তু প্রাথমিক ধাপগুলো পেরোতে না পারায় বাংলাদেশ এখনো টিএসও সদস্যভুক্তই হতে পারেনি। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক, আফ্রিকার দেশ ঘানা, হাইতি, গাম্বিয়ার মতো দেশও এ সংস্থার সদস্য হয়ে পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টের (টিএসএ) ১০ শর্তের মধ্যে পর্যটন সরাসরি জিডিপিতে কতটুকু অবদান রাখছে। পর্যটকের উৎস দেশ কোনগুলো। সেসব দেশ থেকে প্রতিবছর বা মৌসুমে কত সংখ্যক পর্যটক আসে। এ দেশে সরকারের আয়-ব্যয় কত। পরবর্তী বছরে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কত। বিদেশে ভ্রমণ ব্যয় কত। কোন কোন দেশ থেকে পর্যটক টানতে হবে। অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সরকারি ও বেসরকারি খরচ এসব বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সমন্বিত তথ্যভা-ার থাকা বাধ্যতামূলক।পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত তথ্যভা-ার তো দূরের কথা, বাংলাদেশে প্রতিবছর কত লাখ পর্যটক আসছে সে পরিসংখ্যান নেই ট্যুরিজম বোর্ড বা পর্যটন করপোরেশনের হাতে। প্রতিবছর বিদেশ থেকে যে পরিমাণ পর্যটক আসে তাদের মধ্যে আফ্রিকানদের একটা অংশ ভিসার মেয়াদ শেষেও বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তারা কোথায় থাকে, কীভাবে থাকে, কী করছে সে হিসাব নেই সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। পর্যটক বা বিদেশিদের তথ্য সরকারের গোয়েন্দা শাখার (এসবি) হাতে থাকার কথা। কিন্তু নিরুদ্দেশ পর্যটকের খোঁজ না থাকায় তাদের কাছে ধরনা দিয়ে সঠিক তথ্য পাচ্ছে না পর্যটন বিভাগ।বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ড. মো. নাসিরউদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, শুধু পর্যটন করপোরেশন বা ট্যুরিজম বোর্ড দিয়েই পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করা যাবে না। এজন্য দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। আবার এই মাস্টারপ্ল্যান শুধু পর্যটন বিভাগের একার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।তিনি বলেন, সব ধরনের উন্নয়নে পর্যটন খাতকে সম্পৃক্ত বা মাথায় রাখতে হবে। যেখানেই রেলপথ, আকাশপথ, নৌপথ ও সড়কপথ যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হোক সেসব পরিকল্পনায় পর্যটনের বিষয়টি মাথায় রাখা হোক। আজ পদ্মা ব্রিজ হচ্ছে। মানুষ যেন ব্রিজ হয়ে যাতায়াত ছাড়াও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারে, নদীতীরে লঞ্চঘাট আছে সে জায়গাটা যেন পর্যটননির্ভর হয়। যেন সব ধরনের পরিবহন, স্টেশনে খাবার-দাবার, আরামে বসার জায়গা, ওয়াশরুম থাকে। বুড়িগঙ্গাসহ অন্যান্য নদীতীর দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যেন দেখে মনে করে এটি একটি সাজানো বাগান। তাতেই পর্যটনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি পর্যটন খাতে অবকাঠামোগত বা প্রচারমূলক উন্নয়ন কার্যক্রম তো থাকতে হবেই।প্রতিবেশী দেশ ভারতের অন্যতম যোগাযোগ ব্যবস্থা রেলপথ। উন্নত রেল যোগাযোগ ও চাহিদার কারণে বিশাল দেশটিতে অন্তত পাঁচদিন আগেও মেলে না রেলের টিকিট। ভারত ঘুরে দেখা গেছে বিদেশি পর্যটকরা ভ্রমণের দিনও সোনার হরিণ নামক রেলের একটি টিকিট স্বাচ্ছন্দ্যে কিনতে পারে। ভারতে বিদেশিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে আকাশপথ, সড়কপথেও। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বাস ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এ দেশে বাড়ানো হচ্ছে না রেল যোগাযোগ।পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সকাল-বিকালে ভ্রমণের অন্যতম জায়গা নদীতীরও দখল হয়ে গেছে। দূষণে বিষাক্ত শহরঘেঁষা নদ-নদীর পানি। এতে ইকো-ট্যুরিজমের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পর্যটন এলাকাও সেকেলে উন্নয়নে বন্দি। এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সরকারের নৌপরিবহন, বন ও পরিবেশ, পানিসম্পদ, পরিবহন ও যোগাযোগ, রেলপথ, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি তৌফিকউদ্দিন আহমেদ বলেন, মালয়েশিয়া পর্যটন প্রচারে টেলিভিশন-পত্রিকায় বছরে ৭০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ভারতও একই পন্থা বেছে নিয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা দেখছে। বাংলাদেশ কী করছে। পর্যটন স্পট বাড়ানো, অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। পর্যটক এলে হোটেল-পরিবহন-শপিং-ব্যবসা বাণিজ্য সবক্ষেত্রে দেশ লাভবান হবে, যা জিডিপিতে অবদান রাখতে কাজ করবে।বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক নিখিল রঞ্জন রায় আমাদের সময়কে বলেন, পর্যটন শিল্প এগিয়ে নিতে আমরা মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাব রেখেছি। প্রস্তাব পাস হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেব। তারা পরিকল্পনা দেবে। ট্রেনে, বাসে, লঞ্চে বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ কোটা রাখার পরিকল্পনা আছে। ই-ভিসা চালু হলে পর্যটক বাড়বে। এসব ধাপ পূরণ করতে পারলে আন্তর্জাতিক মানদ-ের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে পৌঁছানো সম্ভব। তিনি বলেন, ট্যুরিজম বর্ষে অনেক কিছু পরিকল্পনা ছিল। এতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ বছর ট্যুরিজম বোর্ড ১০ কোটি টাকা পেয়েছে। পর্যটন করপোরেশন পেয়েছে ৪০ কোটি টাকা। ট্যুরিজম বোর্ডের বরাদ্দ দিয়ে নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ‘বিচ হিলটপ’ নির্মাণ, কুয়াকাটায় রাখাইন নৌকাকে রেপ্লিকা, জেলাগুলোয় ট্যুরিজম তথ্যকেন্দ্র নির্মাণসহ দেশ-বিদেশে প্রচারমূলক কাজ চলছে। বাস-ট্রেনে ব্র্যান্ডিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × 4 =