সিরাজুল ইসলাম আবেদ, উখিয়া থেকে ফিরে:  মেয়েটা কখনও হাসছিল, কখনও কাঁদছিল। কাম্না-হাসির দোলায় দোদুল্যমান তাসলিমা কখনও বা ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে একেবারেই অভিব্যক্তিহীন। কখনও আবার গভীর দৃষ্টিতে স্থির তাকিয়ে ছিল মাটির দিকে। ট্রাক থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে রাম্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে ‘সেড’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায়।
মধ্যদুপুরে প্রখর রোদের মাঝেও হাজার দেড়েক বুভুক্ষু মানুষ লাইন ধরে প্রতীক্ষা করছে একটু খাবারের আশায়। নারী-শিশু-বৃদ্ধের দীর্ঘ লাইনে মেয়েটি সহজেই আলাদা হয়ে যায়। আর সবার মতো নয় সে, একটু অন্যরকম।
খাবারের লাইন এগিয়ে গেলে পেছনের মানুষের ধাক্কায় একটু এগিয়ে আবার থেমে যায়। উদ্ভ্রান্তের মতো মেয়েটি এদিক-ওদিক দেখে। আগ্রহ নিয়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলে আয়েশা আক্তার নামে এক স্বেচ্ছাসেবী জানালেন, মেয়েটির নাম তাসলিমা। সবকিছু ঠিকঠাক বলতে পারে না। মাঝে মধ্যে এক-আধটু কথা বলে। আয়েশা তার সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সঙ্গে আসা অন্য শরণার্থীদের কাছ থেকে জেনেছেন, তাসলিমার বাবা-মা দু’জনকেই মগরা মেরে ফেলেছে। জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ি। সবই ঘটেছে তার চোখের সামনে। পরে প্রতিবেশী এক চাচার সঙ্গে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে কুতুপালং ক্যাম্পে। বাবা-মাকে হারিয়ে হতবিহ্বল ১২ বছরের তাসলিমা অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। বাবা-মা’র নাম কী জিজ্ঞাসা করলে দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক কী যেন খুঁজতে থাকে। নির্বাক, হয়তো বাবা-মাকেই খুঁজছে। বাবা কী করতেন জিজ্ঞাসা করলে অস্পষ্ট কণ্ঠে কিছু একটা বলে। আয়েশা অনুবাদ করে দেন, ওর বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। এবার কাঁদতে শুরু করে তাসলিমা, ওর কাম্না সংক্রমিত করে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছর বয়সী আরেক মেয়ে নূর কায়েসকে। দোভাষীর ভূমিকায় থাকা আয়েশা জানান, নূর কায়েসের বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে মিয়ানমার আর্মি। তারপর আত্মীয়-স্বজনহারা নূর কায়েস প্রতিবেশীদের সঙ্গে দশ দিন হলো আশ্রয় পেয়েছে কুতুপালং ক্যাম্পে। ছোট বলেই হয়তো এখনও বুঝে উঠতে পারেনি কী ভয়ঙ্কর পরিণতি তাকে আছড়ে ফেলেছে এই শরণার্থী ক্যাম্পে, ভবিষ্যৎ পরিণতিই বা কীঙ্ঘ সেদিন কী হয়েছিল জানতে চাইলে সে দ্রুত বলে গেল সেই রাতের কথা। ‘প্রথমে বর্মী আর্মি বাবাকে গুলি করে মেরে ফেলে। তারপর ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। অসুস্থ মা ঘরেই শুয়ে ছিল, সে আর বের হতে পারেনি। পরে প্রতিবেশীরা তাকে এখানে নিয়ে আসে।’ নূর কায়েসের কথা অনুবাদ করে দেন আয়েশা। নূর কায়েস কাঁদতে কাঁদতে রোহিঙ্গাদের ভাষায় বলে ওঠে, ‘বাবা-মা আর কোনোদিন আসবে না…?’ চোখের সামনে মৃতু্য দেখেছে, তবু সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না তার বাবা-মা নেই। নূর কায়েসের কাম্নামিশ্রিত কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে কুতুপালংয়ের পাহাড়ে, যেখানে সব হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আরাকান থেকে আসা উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা।
একজন-দু’জন নয়, মিয়ানমার সীমানা পেরিয়ে টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে তাসলিমা ও নূর কায়েসের মতো কয়েক হাজার অনাথ শিশু আশ্রয় নিয়েছে। বাবা-মাকে নৃশংসভাবে হত্যার ট্রমা তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সর্বক্ষণ। হারিয়ে ফেলছে মানসিক ভারসাম্যও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক নাইম গওহর ওয়ারা বলেন, ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে কি-না সেটা আমরা বলতে পারি না। এটা ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়। তবে এসব শিশুর ট্রমাটাইজ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এর থেকে বের করে আনতে তাদের শৈশবকালীন কর্মকান্ড যেমন- খেলাধুলা, ছবি আঁকা প্রভৃতি চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। জরুরি প্রয়োজন- এই শিশুদের ভাষা বোঝেন, মনস্তত্ত্ব বোঝেন এমন ফ্যাসিলেটরের সার্বক্ষণিক পরিচর্যা।’
মিয়ানমার সরকারের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে এ পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছে পাঁচ লাখের বেশি শরণার্থী। পাহাড়ের গায়ে ত্রিপল-পলিথিনের ঝুপড়িতে গড়া শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে আশ্রয় হয়েছে তাদের। পূর্ব কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই মানবতার কারণে বাংলাদেশ এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে ঠিকই, তবে এ ভার বহন করা সত্যিই কষ্টকর। তাই তো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে রোহিঙ্গাদের দিন কাটছে অর্ধাহার-অনাহারে। উখিয়ার সদর রাস্তা থেকে অন্তত এক কিলোমিটার কাদামাটির রাস্তা পেরিয়ে গেলে শুরু কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের মুধুরছাড়া ্ব্নক এলাকা। সেখানে পাহাড়ের গায়ে ত্রিপল-পলিথিনের ঝুপড়ি তুলে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। তাদের সিংহভাগই আবার শিশু। প্রতিটি পরিবারে তিন থেকে পাঁচজন শিশু সেখানকার খুবই সাধারণ চিত্র। সেখানে আট-দশজন সন্তানসহ পরিবারের দেখা পাওয়াও বিচিত্র নয়। এদের মধ্যে ভাগ্যবান তারাই, যাদের বাবা-মা এখনও একই সঙ্গে জীবিত এবং তাদের সঙ্গেই আছে ক্যাম্পগুলোতে। অনেকেরই বাবার কোনো খোঁজ নেই। জানে না তাদের বাবা কোথায়, কীভাবে আছেন। অনেকেই জেনে গেছে তাদের বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই। নিজের চোখেই দেখেছে বাবার হত্যাদৃশ্য। শেষবারের মতো লাশটাও দেখা হয়নি। জানে না আদৌ দাফন করা হয়েছে, নাকি কুকুর-শিয়ালের খাবারে পরিণত হয়েছে। ভিটামাটি ছেড়ে নাফ নদ, বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে পালিয়ে আসার সময় নোনা জল আরও লবণাক্ত হয়েছে এসব বাবা-মা হারানো সন্তানের, স্বামী হারানো স্ত্রীর কিংবা সন্তান হারানো মায়ের চোখের জলে। কিন্তু শেষবারের মতো প্রিয়মুখ দেখার সুযোগ বা সাহস হয়নি কারও। আর নূর কায়েসের মতো অভাগা শিশুরা হারিয়ে ফেলেছে পুরো পরিবারই। কিন্তু কে ফিরিয়ে দেবে কয়েক লাখ তাসলিমা ও কায়েসের স্বাভাবিক শৈশব?
গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে টেকনাফ ও উখিয়ার শরণার্থীদের সঙ্গে থাকা আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার তারেক মাহমুদ সজীব বলেন, ‘খুব দ্রুত এসব হতভাগ্য শিশুকে খুঁজে বের করে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।’ তিনি বলেন, এই কুতুপালং ক্যাম্পের মধুরছড়া ্ব্নকে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের অধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ শিশুকে আমরা শনাক্ত করেছি যাদের বাবা-মা কেউ নেই। পুরো ক্যাম্পে এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেডের তত্ত্বাবধানে এই শিশুদের পৃথক করার উদ্যোগ নিয়েছি। বিতরণ করা হয়েছে নতুন কাপড়, খেলনা ও শিশুখাদ্য।’ উদ্যোগ নিলেও একই সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলতার কথাও জানান সজীব।
মধুরছড়া ্ব্নক থেকে বেরিয়ে আসার পথে আবার দেখা হয় তাসলিমা আর নূর কায়েসের সঙ্গে। রাস্তার পাশে বসেই ট্রাক থেকে সংগ্রহ করা ভাত খাচ্ছিল তারা। তাসলিমার আঙুলের নখগুলো মেহেদির রঙে রাঙানো। শখ করেই দিয়েছিল হয়তো। কিন্তু মেহেদির রঙ তাদের মনে আর আনন্দ নিয়ে আসে না। বরং মনে করিয়ে দেয় বাবা-মায়ের রক্তাক্ত দেহের কথা, ভিটাবাড়িতে লাগিয়ে দেওয়া আগুনের কথা। যে আগুনে হারিয়ে গেছে তাদের শৈশব, সামনে শুধুই অন্ধকার।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × 3 =