মেহেদী হাসান:

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান বন্ধ, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সসম্মানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা—মিয়ানমারের এ তিনটি করণীয় বিষয়ে একমত পোষণ করেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা।

গত শুক্রবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিরাপত্তা পরিষদের ‘আরিয়া ফর্মুলা’ বৈঠকে পরিষদের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যে একমত পোষণ করেন।

নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি ফ্রান্স ও অন্যতম স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্যের অনুরোধে আয়োজিত ওই বৈঠকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান রাখাইন রাজ্য নিয়ে গত আগস্ট মাসে মিয়ানমার সরকারের কাছে দাখিল করা প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো তুলে ধরেন।

বৈঠকের পর কফি আনান সাংবাদিকদের বলেন, ‘কী করা প্রয়োজন সে বিষয়ে এ বৈঠকে সবাই সম্মত হয়েছে। স্বল্প মেয়াদে করণীয়গুলো হলো সহিংসতা বন্ধ করা, যাদের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন তাদের কাছে তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমার ছেড়ে যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে সহায়তা করা। ’

কফি আনান বলেন, এটি সহজ কাজ নয়। রোহিঙ্গারা কেবল তখনই ফিরে যাবে যখন তারা মিয়ানমারে নিরাপদ বোধ করবে এবং উন্নত জীবনের ব্যাপারে আস্থা ফিরে পাবে।

বৈঠকের পরপরই জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ম্যাথু রায়ক্রফট টুইট বার্তায় বলেন, সহিংসতা বন্ধ করুন। ত্রাণ কার্যক্রমের সুযোগ এবং রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করুন। বৈঠকে কফি আনান, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে মিয়ানমারকে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন জানায়, নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যই এ সংকট সমাধানের পক্ষে বক্তব্য দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি একে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘এনাফ ইজ এনাফ (যথেষ্ট হয়েছে)। আমরা এটি আর মেনে নিতে পারছি না। আমরা মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর এ অপকর্মের কাজের নিন্দা জানাই। ’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি রাখাইনে অনতিবিলম্বে মানবিক সহযোগিতা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি, সহিংসতা বন্ধ, জাতিসংঘের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের’ পূর্ণ প্রবেশাধিকার, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও নিশ্চয়তার সঙ্গে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনসহ কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। প্রায় একই সুরে কথা বলেছে নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সব সদস্য রাষ্ট্র। তারা সবাই রোহিঙ্গদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে।

নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের বাইরে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর, মানবিক সহায়তা দপ্তর, শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

আরিয়া বৈঠকে জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত জোয়াও ভেলি ডি আলমেইদা বলেন, মিয়ানমার সরকারকে অনতিবিলম্বে অবশ্যই রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর পূর্ণ, নিরাপদ ও নিঃশর্ত প্রবেশাধিকার দিতে হবে। মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার পরিবেশ অবশ্যই সৃষ্টি করতে হবে।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি বৈঠকে জানিয়েছেন, রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধ হয়েছে। তবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন ওই বৈঠকে বলেন, “দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো মিয়ানমার সরকারের দেওয়া বিবৃতি আর রাখাইন প্রদেশের প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ‘র্যাপিড রেসপন্স মিশনের’ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এমনটি তুলে ধরা হয়েছে। ”

মাসুদ বিন মোমেন আরো বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের অংশগ্রহণ ও তদারকি ছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল সমস্যা সমাধান করা কঠিন হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংকটের শিকড় মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারে নিহিত। ’

বৈঠকের পরপরই যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ম্যাথু রায়ক্রফটকে পাশে রেখে জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ফ্রাঁসোয়া দেলাত সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাজ্যকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকের আয়োজন করেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। তিনি আরো বলেন, ‘পাঁচ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শত শত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলছে। ’

ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ওই বৈঠক আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল দুটি। এর একটি হলো মিয়ানমার সৃষ্ট অচলাবস্থার নিন্দা জানানো। সহিংসতা বন্ধ, পূর্ণ মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে মিয়ানমারের ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের দেশটির কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। ’

ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারকে আলোচনা জোরদার করারও আহ্বান জানান। বৈঠকের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো এবং সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতি সমর্থন জানানোর কথা উল্লেখ করেন।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত গত শুক্রবার রাতের ওই বৈঠকের আরেকটি উদ্দেশ্য হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের রোহিঙ্গা সংকট অনুধাবন এবং সংকট মোকাবেলায় নিজেদের ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়সংকল্প হওয়ার দায়িত্বের কথাও জানান।

যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানে কী কী করা প্রয়োজন সে বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও আরো কিছু দেশ ছাড়াও জাতিসংঘ পরিবার ও বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধিরা কফি আনানের কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হয় মানবসৃষ্ট এই ট্র্যাজেডির মাত্রা বুঝতে পেরে আমরা সবাই হতভম্ব হয়েছি। ’

গত ২৫ আগস্ট ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির’ (আরসা) হামলার পর এটি শুরুর কথা উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে নির্বিচার ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তাতে তিনি অসুস্থ বোধ করছেন। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের লক্ষ্য করে ওই অভিযান যে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ তা অস্বীকার করা কঠিন।

তিনি আরো বলেন, ‘সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। ত্রাণ অবশ্যই পৌঁছাতে হবে (রাখাইন রাজ্যের ভেতর)। শরণার্থীদের (রোহিঙ্গাদের) অবশ্যই তাদের বাড়িঘরে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দুর্দশার জন্য দায়ীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। ’

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানে সমন্বিত ও টেকসই প্রচেষ্টার ওপর কফি আনান জোর দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানান রাষ্ট্রদূত ম্যাথু রায়ক্রফ্ট। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চি গত বৃহস্পতিবার এক বক্তব্যে রাখাইন রাজ্যের সমস্যা সমাধানে যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের দিকেও নিবিড় দৃষ্টি রাখার কথা জানান রায়ক্রফ্ট। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সব জনগণের মঙ্গলের জন্য প্রকৃত অগ্রগতির একটি সুযোগ এসেছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ওই সুযোগ কাজে লাগানো নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাবে।

সহিংসতা বন্ধ না করলে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ম্যাথু রায়ক্রফ্ট বলেন, ‘আমি যে বিষয়গুলো বলছি, সেগুলোয় বিশদভাবে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সম্মত হয়েছে। কী করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে বড় ধরনের ঐকমত্য আছে। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস যে তিনটি করণীয়র কথা বলেছেন, সেগুলোই করণীয় নিয়ে ঐকমত্যের সারাংশ। সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা—স্বল্প মেয়াদে এগুলোই করণীয়। দীর্ঘ মেয়াদে করণীয়র মধ্যে আছে, সহিংসতার হোতাদের বিচার ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা বড় মাত্রার ঐকমত্যের কথা শুনেছি। নিরাপত্তা পরিষদের সবাইকে এক অবস্থানে নিয়ে আসার ব্যাপারে কাজ চালিয়ে যেতে আমি আশাবাদী। সেখানে কারো মতপার্থক্য থাকলে তা-ও আমরা নিরসনের চেষ্টা করব। ’

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু—এ প্রশ্নের উত্তরে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বেশির ভাগই অনতিবিলম্বে যাতে দেশে ফিরে যেতে পারে, সে জন্য আমরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি। ’

কফি আনান বলেন, রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। তিনি মূলত তাঁর নেতৃত্বে রাখাইন কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর জোর দিয়েছেন। ৯ সদস্যের ওই কমিশনে ছয়জন ছিলেন মিয়ানমারের। এর পরও তেমন বড় কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি ছাড়াই ঐকমত্যের ভিত্তিতে তাঁরা প্রতিবেদন তৈরি করতে পেরেছিলেন। ওই প্রতিবেদন ছিল শক্তিশালী, গঠনমূলক ও সৎ।

কফি আনান আরো বলেন, তিনি তাঁর প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছিলেন যে রোহিঙ্গাদের তাদের গ্রামে ফিরতে দেওয়া উচিত। তাদের গ্রামগুলোও পুনর্নির্মাণ করা উচিত। প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আন্ত সম্প্রদায় সংলাপ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চলাফেরার অধিকার থেকে শুরু করে তাদের মূল সমস্যা নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়ার বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে।

কফি আনান বলেন, তাঁর সুপারিশসংবলিত ওই প্রতিবেদন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সু চি গ্রহণ করেছেন ও সেটি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। এ জন্য তিনি একটি আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটিও গঠন করেছেন। জেনেভা থেকে নিউ ইয়র্কে আসার আগে ওই কমিটির দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সু চি একটি পরামর্শক গ্রুপও গঠন করেছেন। সেখানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও থাকবেন। এর মাধ্যমে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সংলাপের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

কফি আনান বলেন, মিয়ানমার, নিরাপত্তা পরিষদ, মানবিক ও উন্নয়ন সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো তাঁর প্রতিবেদন গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটি  (প্রতিবেদন) একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। আর এ নিয়ে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কাজ করতে পারে।

এক প্রশ্নের উত্তরে কফি আনান বলেন, মিয়ানমার যে অত্যন্ত কঠিন একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা-ও সবার মনে রাখা উচিত। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সেনাশাসিত মিয়ানমারে কোনো কিছুর ব্যবস্থাপনা বেশ কঠিন। নিরাপত্তা পরিষদকে তিনি মিয়ানমার সরকারের কাঠামোর দ্বৈত রূপের কথা জানিয়েছেন। তাঁর সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনী—দুই পক্ষকেই চাপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেছেন।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বাধ্য করতে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদ আনছে কি না এবং মিয়ানমারের প্রতিনিধি কী মন্তব্য করেছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে কফি আনান হাসতে হাসতে সাংবাদিকদের বলেন, গোপনীয় আলোচনা বলেই সাংবাদিকদের সেখানে রাখা হয়নি। তিনি আশা করেন, এমন একটি উদ্যোগ আসবে, যাতে মিয়ানমার সরকার চাপ অনুভব করে রোহিঙ্গাদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে বাধ্য হয়।

কফি আনান বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের আশ্রয় শিবির ছেড়ে মিয়ানমারে আশ্রয় শিবিরে ফেরত পাঠানো ঠিক হবে না। তাদের বাড়িঘর নির্মাণ করতে সহায়তা ও শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ‘তাঁরা (আনান কমিশন) পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার সুপারিশ করেছেন। কারণ এটি করতে না পারলে এ সমস্যা শুধু এই অঞ্চলের জন্য সংকট হবে না, আমাদের সবার জন্যই গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। ’

মিয়ানমার সহিংসতা না ছাড়লে বিকল্প কোনো চিন্তা আছে কি না জানতে চাইলে কফি আনান বলেন, এক বছর ধরে তিনি ও তাঁর নেতৃত্বে কমিশন রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে কাজ করে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাঁর কোনো বিকল্প চিন্তা নেই। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ সমাধান ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে।

এখনো কী মিয়ানমারে সংঘাত চলছে—এ প্রশ্নের উত্তরে কফি আনান বলেন, ‘আমাদের যা বলা হয়েছে তা থেকে মনে হচ্ছে, সামরিক অভিযান বন্ধ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা ঢল এখনো অব্যাহত আছে। অভিযান যদি থেমেই যায়, তবে তারা কেন দেশ ছাড়ছে? তাদের দেশ ছাড়ার পেছনে কী ভূমিকা কাজ করছে? ক্ষুধা? অন্য মিলিশিয়াগোষ্ঠীগুলোর হামলা? নাকি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়? জীবিকা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে একঘরে হওয়ার ভয়ে? আমি সত্যিই জানি না, আমাদের বলা হয়েছে এবং মিয়ানমারের মন্ত্রী আজও বলেছেন যে সামরিক অভিযান শেষ। ’

উল্লেখ্য, আরিয়া ফর্মুলা বৈঠক নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক না হলেও পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য এ বৈঠক বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯২ সালে ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রদূত দিয়েগো আরিয়া এ ধরনের বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর নামেই এমন অনানুষ্ঠানিক বৈঠক ‘আরিয়া ফর্মুলা’ বৈঠক নামে পরিচিত।

এদিকে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা স্রোত গতকালও অব্যাহত ছিল। পরিস্থিতি দেখতে মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদি দুদিনের সফরে এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মহাপরিচালক ল্যাসি সুইং চার দিনের সফরে আজ রবিবার ঢাকায় আসছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হক গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট থেকে এ অঞ্চলে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি হতে পারে। সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 + nine =