মিয়ানমারকে শাস্তি নয়, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকটের সুষ্ঠু সমাধান চায়।

রোববার ঢাকায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ষষ্ঠ অংশীদারিত্ব সংলাপে অংশগ্রহণ শেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে সংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রলয়ের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস শ্যানন।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রর মিয়ানমারের প্রতি চাপ অব্যাহত রেখেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র যে কোনও সময় যে কোনও ধরনের নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি।

যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক জানান, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারিত্ব সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এখন পর্যন্ত ৩১টি পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের অংশীদারিত্ব সংলাপের বড় অংশ জুড়েই রোহিঙ্গা সংকট পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা হয়েছে। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দু’দেশের বানিজ্য সহযোগিতার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গটিও তোলা হয়। তবে এ বিষয়ে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি এ ব্যাপারে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গও আলোচিত হয়।

ষষ্ঠ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ অংশীদারিত্ব সংলাপ গত পহেলা নভেম্বর ঢাকায় শুরু হয়। প্রথম দিনে দু’দেশের প্রতিনিধিরা এবারের সংলাপের জন্য আলোচ্যসূচি চূড়ান্ত করেন। পরে তিন দিনের বিরতির পর রোববার চূড়ান্ত সংলাপে অংশ নেন দু’দেশের প্রতিনিধিরা।

রোববারের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস শ্যানন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় প্রায় দু’ঘন্টা এ অংশীদারিত্ব সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপ শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গেও একান্ত বৈঠক করেন থমাস শ্যানন।

পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে থমাস শ্যানন বলেন, সংলাপে দু’দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলাপ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠি, উত্তর কোরিয়ার আচরণ প্রসঙ্গ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট। এই সংলাপ প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একত্রে কাজ করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক সেতু, স্থায়িত্ব এবং সমৃদ্ধির স্তম্ভ। একটি মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র। দায়িত্বশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত অংশীদার পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে চলমান মানবাধিকার সংকট নিয়েও সংলাপে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে। মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনে ঘটে যাওয়া নৃশসংতার মাত্রা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের কথা সংলাপে পুর্নব্যক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসন এর আগে পৃথকভাবে উত্তর রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তাও সংলাপে অবহিত করা হয়েছে। পাঁচ লাখে বেশি বিপন্ন রোহিঙ্গাকে জরুরি আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ  সরকার যে উদারতার পরিচয় দিয়েছে তারও প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এক প্রশেুর জবাবে তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের উপর চাপ অব্যাহতম রেখেছে এবং রাখবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে উত্তর রাখাইন পরিস্থিতির উপর গভীরভাবে নজর রাখছে এবং করনীয় নির্ধারণ করছে।

মিয়ানমারের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হচ্ছে কি’না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিয়ানমারকে শাস্তি নয়, যুক্তরাষ্ট্র চায় রোহিঙ্গা সংকটের সুষ্ঠু সমাধান। আর এ সমাধানের জন্য প্রয়োজন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। সে লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এই ইস্যুতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে অনেক ধরনের উদ্যেগ নিয়েছে। এসব উদ্যেগে যুক্তরাষ্ট্রও সহায়তা দিচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখন পর্যন্ত কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু আলাপ আলোচনা এবং পর্যালোচনা নিয়মিত চলছে এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। পরিস্থিতি বিবেচনায় যে কোন মুহূর্তে যে কোনও ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, অংশীদারিত্ব সংলাপে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও সম্পর্কের সবগুলো বিষয়ই আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বানিজ্য এবং রোহিঙ্গা সংকট ইস্যু প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিনরা জানান উত্তর রাখাইনে নৃশংসতা বন্ধ এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে চাপ দিতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৩১টি পদক্ষেপ নিয়েছে। এ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত জোরালোভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে বলেও জানিয়েছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

fifteen − 11 =