একসময় ‘নজত’ নামের ছোট্ট মেয়েটি মাঠে ভেড়া চরাতেন। মেয়েটির পুরো নাম নজত বেল কাসেম। জন্ম ১৯৭৭ সালে। মরক্কোর সাধারণ ও গরিব মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া নজত নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেলেন অনেক পরে।

বাবা ছিলেন নির্মাণকর্মী। তাই আয় ছিল সামান্য। সেই সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন তার বাবা। পড়াশোনার সুযোগ ছিল সীমিত; কিন্তু নজতের জেদ ছিল, পড়াশোনা তাকে করতেই হবে। সারা দিন মাঠে ভেড়া চরিয়ে তাকে সময় পার করতে হতো।

তদুপরি সন্ধ্যায় বেরোতে হতো মায়ের সাথে দুধ বিক্রি করতে। বাড়ি ফেরা হতো রাতে। তবে রাজ্যের ক্লান্তি ও শ্রান্তি নিয়েও নজত মনোযোগ দিতেন পড়াশোনায়। একসময় বাড়তি আয়ের ভার এবং সংসার চালানোর দায় নিয়ে নজতের বাবা চলে যান ফ্রান্সে। কিছু দিন পর পরিবারকেও সেখানে নিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে পড়াশোনা থামেনি নজতের।

২০০২ সালে প্যারিস ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজ থেকে নজত স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি সোস্যালিস্ট পার্টির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন এবং এ পার্টিতে যোগ দেন।

জীবন সংগ্রামী নজতের কাছে পরিশ্রম ও দারিদ্র্য খুব পরিচিত। স্বভাবতই তাদের মতো গরিব পরিবারগুলোর জন্য লড়াই করাকে তিনি দায়িত্ব ভাবলেন। নজত একই সাথে লড়াই করেছেন বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে।

মেধা, অধ্যবসায় ও সক্রিয় ভূমিকা নজতকে ধীরে ধীরে ফ্রান্সের রাজনীতিতে অন্যতম পরিচিত মুখ করে তোলে। ২০০৮ সালে নজত রোন আল্পাইন এলাকা থেকে কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। তারপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

নিজের যোগ্যতা ও টিকে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টা তাকে সাহায্য করেছে। তিনি নির্বাচনে কয়েকবার পরপর জিতে এসেছেন। এখান থেকেই ফরাসি রাজনীতির জগতে নজতের সাফল্যের সিঁড়ি ভাঙা শুরু।

নজত ২০১২ সালে ফ্রান্সের নারী অধিকার মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে সাফল্য প্রদর্শন করেছেন। এমনকি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের মুখপাত্রও নিযুক্ত হন।

কর্তব্যনিষ্ঠা ও দক্ষতার কারণে ২০১৫ সালে নজতকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ। নজত নিজেকে ‘কাজপাগল’ হিসেবেই শুধু প্রতিষ্ঠা করেননি, তার যোগ্যতা ও দক্ষতার সুনাম সবার কাছে স্বীকৃত।

প্রথমত, নজত একজন নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত না করে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। মানবিক যোগ্যতা তাকে সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে নৈতিক শক্তি ও মানবিক গুণাবলি।

সাদিক ও নজতরা সময়ের সাহসী সন্তান। তারা শুধু নিজেরা পরিচিত হন না, তাদের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা পায়। এর সুফল ভোগ করে তাদের জাতি। প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মোকাবেলা করেই তারা দাঁড়িয়ে যান।

তারা টিকে থাকেন প্রতিকূলতাকে জয় করেই। প্রান্তিক চিন্তার ওপর মানবতাবাদ, দক্ষতা-যোগ্যতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা- এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলধারায় জায়গা করে নেন। সাদিক খানরা হয়ে ওঠেন উপমা। নজতরা দেখাতে পারেন বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও যোগ্যতার সাথে টিকে থাকার দৃষ্টান্ত। হতে পারেন অন্যদের অনুপ্রেরণা।

জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় উঠে না এলে নজত কিংবা সাদিকরা সময়ের আবর্তে হাবুডুবু খেতেন। আগ্রাসী প্রচারণা ও সন্ত্রাসী তকমা পরিয়ে দেয়ার প্রবণতা রুখে দিতে পারতেন না। নতুন প্রজন্মের সামনে পথ চলার রাস্তা একটিই; তাদের বিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হতে হবে।

যোগ্যতাকে এতটা শাণিত করতে হবে- যাতে নিয়তি এসে ‘সালাম ঠুকতে’ বাধ্য হয়। মূলধারায় উঠে আসার পথ আগলে দাঁড়ানোর মতো দুর্মতি ও দুঃসাহস যেন কারো না থাকে। তবেই সাদিক ও নজতের মতো রোলমডেল হওয়া সম্ভব হবে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × two =